রমজানের শিক্ষা
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৩, ২১:৩২
রমজান রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, আত্মঅহংবোধ ভুলে গিয়ে সুখী ও সুন্দর সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার মাস হচ্ছে রমজান মাস। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য রমজান মাস হচ্ছে অনাবিল আনন্দের। এ আনন্দ হচ্ছে ত্রিশটি রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের আনন্দ। এ আনন্দ হচ্ছে লাইলাতুল কদরের নিয়ামত প্রাপ্তির আনন্দ। এ আনন্দ হচ্ছে সাদাকাতুল ফিতর বিতরণের আনন্দ।
রমজান মাস ভোগবিলাস, অপচয় এবং অসংযমের গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে মানুষকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়। আত্মসংযমের মাধ্যমে বিশ্বাসীরা যাতে ইন্দ্রিয়গত ও আত্মিক উভয় দিক থেকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানে নিয়োজিত হয় সে উদ্দেশ্যে সব সুস্থ ও সাবালক নর-নারীর জন্য সিয়াম সাধনাকে অবশ্য পালনীয় ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পবিত্র মাসে বিশ্বাসী মানুষ সত্য-সুন্দর ও কল্যাণের পথে উদ্বুদ্ধ হয়। যা কিছু অকল্যাণকর তা পরিত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের প্রয়াস পায়।
মাহে রমজানের শিক্ষা আত্মসংযমের মহিমামণ্ডিত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, ঐশী নির্দেশ লঙ্ঘন করে এ মাসকে কেউ কেউ অসংযম ও লোভ-লালসা পূরণের সুযোগ হিসেবে বেছে নেয়। সিয়াম সাধনায় নিয়োজিত বিশ্বাসী মানুষের জন্য বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে তাদের অসংযত মনোভাব। রোজার মাসে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বা দাম বাড়িয়ে রোজাদারদের কষ্টের মুখে ঠেলে দেওয়া সামাজিক দৃষ্টিতে যেমন গর্হিত, তেমন ধর্মীয় দিক থেকেও গুনাহ বলে বিবেচিত। মাহে রমজানকে যারা নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে বেছে নেয় তাদের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ গর্হিত কর্মকাণ্ড দমন রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা সরকারের কর্তব্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। সরকার এক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে তার ওপর রোজাদারদের স্বস্তি যেমন নির্ভরশীল তেমনি নির্ভরশীল সুনামও।
প্রতি বছর যেটি দেখা যায় সেটি হচ্ছে তেল, চিনি ও ছোলাসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কেন পণ্যের দাম বেড়ে যায়, কেন সিয়াম সাধনার মাসে ব্যবসায়ীদের একাংশ মুনাফাখোরিতে লিপ্ত হচ্ছে তা আমলে নিতে সরকারকে অবশ্যই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। প্রতিটি ধর্মেই মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে ধর্ম নিয়ে নেতিবাচক কার্যক্রম যতটা আগ্রহের সঙ্গে করা হয়, ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাকে সেভাবে অনুসরণ করা হয় না। অথচ সমাজ-জীবনে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার প্রতিফলন জরুরি।
অতীতের দুঃখজনক নজির থেকে বলা যায়, রমজান মাসে যানজট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রেও সরকারকে তীক্ষ্ম নজর রাখতে হবে। পবিত্র ঈদকে সামনে রেখে যাতে কোনোভাবে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য অনুভূত না হয় সে ব্যাপারেও আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যত্নবান হতে হবে।
রমজানের শিক্ষা হচ্ছে সামাজিক দায়বদ্ধতা, পারিবারিক দৃঢ়বন্ধন, রাষ্ট্রীয় সুবিচার, ন্যায়পরায়নতা, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, আত্মার সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। শোষণ, নিষ্পেষণ, হঠকারিতা, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন থেকে দূরে থাকা। রমজান রোজাদারদের ইবাদত-বন্দেগির ভেতর দিয়ে সব ধরনের অন্যায়-অত্যাচার, অশোভন-অনাচার, দুরাচার-পাপাচার ও যাবতীয় অকল্যাণকর কাজকর্ম থেকে বিরত হয়ে সংযম সাধনার পথ ধরে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়।
মাহে রমজানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সকল প্রকার নাফরমানি কাজ থেকে দূরে থাকার নামই তাকওয়া। আল্লাহর কাছে বান্দার মান-মর্যাদা নির্ধারণের একমাত্র উপায় তাকওয়া। সুতরাং যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে বিরত থেকে ভালো কাজ করতে পারলেই রোজা পালন সফল ও সার্থক হবে।
রমজান মাস থেকে তাকওয়া শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। খোদাভীতি অর্জন করার ক্ষেত্রে রোজার কোনো বিকল্প নেই। রোজার শিক্ষা নিয়ে তাকওয়ার গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষ ইহকালীন কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তি লাভ করতে পারে। ঈমান ও আত্মবিশ্লেষণের সঙ্গে রোজা রাখলে জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এ শিক্ষা যদি বাকি ১১ মাস কাজে লাগানো যেতো, তাহলে পৃথিবীতে এত অশান্তি, অনাচার থাকতো না।
ঢাকা