মাছের উত্পাদন কেন বাড়ানো যাবে না
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৩
প্রতি বছর জুলাই মাসে মত্স্য সপ্তাহ আসে। এ সময়ে প্রধানত দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছ উত্পাদন ও মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে মত্স্য বিভাগ নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে । এর প্রভাব জন-জীবনে লক্ষ করা যায়। কয়েক বছর আগে যেখানে বাজারে মাছই পাওয়া যেতো না, এখন চাষের মাছ হলেও এবং মাছের বাজারে গুটিকয় প্রজাতির প্রাধান্য থাকলেও বাঙালি মাছ তো খেতে পারছে। অভ্যন্তরীণ মত্স্য উত্পাদনের এই সাফল্যের নিরিখে বলা যায়, এই ধরনের কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মত্স্য উত্পাদন বৃদ্ধির দিকেও এবার দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
একদা প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরে সমপদের কাণ্ডজ্ঞানহীন ও মাত্রাতিরিক্ত আহরণের ফলে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এক কালের ভাণ্ডার নিঃশেষ হয়েছে বহু আগেই। যাও বা ধুক ধুক করে অবশিষ্ট ছিল পশ্চিম উপকূলের সুন্দরবনে, বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ বলে, বিগত সিডর তার যে পরিমাণ লণ্ডভণ্ড ও সম্পদহানি করেছে তা আজও পূরণ হয়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লাগামহীন ও অনৈতিকভাবে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় শামিল সরকারি-বেসরকারি উভয় পক্ষ। উপকূলীয় এলাকায় নানা রকম সনাতন ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করে একদিকে যেমন পোনা মাছসহ প্রায় সব মাছ ছেঁকে তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি ভ্রান্ত নীতির কারণে ধারণ ক্ষমতার অধিক মাত্রাতিরিক্ত যান্ত্রিক ট্রলার ব্যবহার করে সমুদ্র প্রায় মাছশূন্য করে ফেলা হচ্ছে। এর পরও প্রতিটি সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক নতুন নতুন ট্রলারের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে। উপকূলীয় প্যারাবন কেটে সাফ করে দেওয়া হয়েছে— যার অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য অপরিসীম। এর ফলে মাছসহ অন্যান্য ছোট-বড় সকল জলজ প্রাণীর অবাস, খাদ্য ও প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। মাত্রাতিরিক্ত আহরণের ফলে অগভীর জলাশয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও প্রাণীর খাদ্য-জোগান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে সামুদ্রিক মাছের উত্পাদন প্রতি বছর একটু একটু করে বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে উত্পাদন না বাড়লেও, পরিমাণগত উত্পাদন বাড়িয়ে দেখানো হলেও ধরা মাছের গুণগতমান বেশ নাজুক। অর্থাত্ ধরা মাছের প্রায় পুরোটাই স্বল্পদামের কিশোর বা ছোট মাছ যা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বড় হয়ে ডিম পেড়ে আরো অনেক কিশোর মাছ উত্পাদন করতে পারতো। একইসঙ্গে বেশি বেশি দেশিয় সনাতন ক্ষতিকর জাল, যেমন মোহনা-বেহুন্দি বা সাগর-বেহুন্দি এবং উপকূলের কাছাকাছি যান্ত্রিক ট্রলার বা ধারণ ক্ষমতার বেশি যান্ত্রিক ট্রলার ব্যবহারের ফলে কিশোর মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না । ছোট মাছ বেশি ধরাতে মোট পরিমাণ কখনও কখনও সামান্য হয়তো বাড়ছে, তবে মূল্য কম পাওয়ায় ছোট থেকে বড় সব মত্স্যজীবীর লাভের অংকে ভাটা পড়েছে। গরিব সনাতন মত্স্যজীবীদের তাতে সংসার চালানোর মতো আয়ের সংস্থান হচ্ছে না, যান্ত্রিক নৌকা বা জালের মালিক মহাজনদের লগ্নিকৃত পুঁজি উঠে আসছে না, ট্রলারওয়ালাদের ট্রিপপ্রতি লোকসানের পরিমাণ বাড়ছেই। আয় বাড়াতে বা ক্ষতি পোষাতে সকল সতরের মত্স্যজীবীরাই আরো অধিক মাছ আহরণে নিয়োজিত হচ্ছে। এতে প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়ছে উপকূলীয় জলাশয়।
বঙ্গোপসাগরের আমাদের অংশের তলদেশ, বিশেষ করে সুন্দরবনের লাগোয়া উপকূল থেকে মহীসোপান পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই বালি ও কাদাময়, খুব সামান্য অংশই কঠিন শীলা বা পাথর দ্বারা আবৃত। এখানে অসংখ্য ধারায় মিঠাপানি প্রবাহের ফলে তীর থেকে বহু দূরে গেলে স্বাভাবিক লবণাক্ততাসম্পন্ন সমুদ্রের পানি পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নদীতে মিঠাপানি প্রবাহের পরিমাণ বেশি বলে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা হ্রাস পাওয়ার ব্যাপ্তি সাগরের উপরিভাগের বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়। শীতকালে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় সঠিক লবণাক্ততা উপকূলের খুব নিকটেই পাওয়া যায়। পোনা ও কিশোর মাছ উপকূলের কাছাকাছি কম লোনা পানিতে থাকে। মাছ যতই বড় বা পরিণত হতে থাকে ততই অধিক লবণাক্ত গভীর সমুদ্রের দিকে চলে যেতে থাকে। তলদেশে বসবাসকারী প্রজাতি তলদেশ ধরে চলাচল করে। অন্যদিকে দ্রুত সঞ্চরণশীল ভাসমান প্রজাতি পানির উপরিতল ঘেঁষে বা তার সামান্য নিচ দিয়ে চলাচল করে।
আকার, স্বাভাবিক আবাসস্থল ও চলাচল পথের ওপর ভিত্তি করে মাছ সমুদ্রের তলদেশে, অপেক্ষাকৃত গভীর পানিতে অথবা উপরিতলের সামান্য নিচে ডিম পাড়ে। মাছ যেখানেই ডিম পাড়ুক না কেন নিষিক্ত হয়েই তা পানির ওপরে ভেসে ওঠে। পানির উপরিতলে মাছের ডিম ফুটে প্রথমে রেণুপোনা উত্পন্ন হয়। রেণুপোনা পানির স্রোতে ভেসে ভেসে উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। এখানে তারা বিশ্রাম নেয় ও আকৃতি পালটায়, দ্রুত খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে এবং বড় হয়ে আবার গভীর সমুদ্রে নিজস্ব আবাসস্থলে ফিরে যায়। এভাবে মাছের জীবনচক্র চলতে থাকে। উপকূল থেকে বা গভীর সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সময় তাদের ধরে ফেললে বড় হয়ে আবার ডিম দেওয়ার মতো মা-মাছ আর থাকলো কই? তাই তো উপকূলে বছরের পর বছর ধরে একই পরিমাণ মাছ আহরণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
উপকূলে বছরের পর বছর ধরে একই রকম পরিমাণ মাছ পেতে হলে করণীয় কী? এর জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ করা, সমুদ্রের গুণগতমান বজায় রাখা এবং সঙ্গে সঙ্গে মত্স্য সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ থেকে বিরত থাকা, বিশেষ করে দিনে দিনে কমতে থাকা মাছ বা জলজ প্রাণীর আহরণে যথেষ্ট সর্তকতা অবলম্বন করা। প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই আহরণের জন্য জীববৈচিত্র্যকে অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। উপকূলীয় মত্স্য সম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মত্স্য ্বিভাগ ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি উপকূলীয় মত্স্যজীবী, বৃহদায়তন মত্স্য-আহরণকারী বা ট্রলার মালিক, ব্যবসায়ী, পুিঁজ লগ্নিকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী, সমপ্রসারণকর্মী, গবেষক ও উন্নয়ন কর্মীসহ সকল সুফলভোগী ও অংশীদারগণ মিলে উপকূলীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এই কাজটি শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়। এখন থেকেই আমরা প্রতি বছর ‘জাতীয় উপকূল-সপ্তাহ’ পালন করে সুফলভোগীদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে পারলে এক সময় আবার উপকূলকে মাছে মাছে ভরে দিতে পারি। আমরা এর জন্য কিছু করণীয় নির্ধারণ করতে পারি । যেমন উপকূলে মোহনা বেহুন্দি নিষিদ্ধ করে মোহনা বেহুন্দির জেলেদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে সাগর-বেহুন্দিতে স্থানান্তরিত বা প্রতিস্থাপিত করতে পারি। সাগর বেহুন্দির জেলেদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে গভীর সমুদ্রে বা একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় লং-লাইনিং-এর মাধ্যমে টুনা বা অন্যান্য ভাসমান প্রজাতির মাছ আহরণে নিয়োজিত করতে পারি। চল্লিশ মিটার গভীরতার বাইরে যান্ত্রিক ট্রলারের মাছ ধরার আইনের বিধানটি কড়াকড়িভাবে পালন করতে পারি। সরকারি পর্যায়ে আর একটিও বটম বা মিড-ওয়াটার ট্রলার বর্তমান ট্রলার বহরে সংযোজিত না করার বিষয়ে প্রতিজ্ঞ থেকে সকলে আইনের বিধানের প্রতি একনিষ্ঠ হতে পারি। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ চাষে আকাশ পরিমাণ সাফল্য পেতে পারলে উপকূলীয় জলাশয়ে মাছের উত্পাদন কেন বাড়াতে পারবো না?
ময়মনসিংহ