সবার উপরে মানুষ সত্য

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রথিতযশা গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইনরিটি রাইটস গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল (এমআরজিআই) গত কয়েক বত্সরের মত এইবারও পিপলস আন্ডার থ্রেট শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করিয়াছে। নিয়মবদ্ধ প্রণালীতে প্রাপ্ত নানাবিধ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রে মানুষের জীবন কতখানি হুমকির মধ্যে আছে তাহা পরিমাপ করিয়া প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে এমআরজিআই। গত বত্সরের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত এইবারের তালিকাতে মানুষের জীবন সর্বাপেক্ষা ঝুঁকির মধ্যে থাকা রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সর্বাগ্রে স্থান পাইয়াছে সোমালিয়া। তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের অন্যগুলি হইতেছে সুদান, আফগানিস্তান, ইরাক, মায়ানমার, পাকিস্তান, কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, ইথিওপিয়া ও ইরান। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের প্রতিবেদনেও ইথিওপিয়া ও ইরান বাদে অন্য দেশগুলি শীর্ষ দশের মধ্যেই ছিল। গবেষণায় দেখা যাইতেছে যে, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ঘোরতর সশস্ত্র সংঘাত, এলিটদের মধ্যেকার বিভাজন, প্রতিহিংসার সংস্কৃতি, আইনের শাসনের দুর্বলতা ও রাজনীতিক অস্থিতিশীলতার মত বাস্তবতাগুলিই মূলত বেসামরিক নাগরিকদের জীবনকে ক্রমাগত হুমকির মধ্যে ফেলিয়া দিতেছে বিশ্বজুড়িয়া। মানুষ বিপুল সংখ্যায় প্রাণে মরিতেছে এই সকল কারণে। এইবারের প্রতিবেদন মতে মানুষের জীবন সর্বোচ্চ মাত্রাতে হুমকির মধ্যে থাকা শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে আটটিতেই সামপ্রতিক সময়ে বা দীর্ঘদিন ধরিয়া কোন না কোন কারণে ভিনদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়াছে। এই দেশগুলিতে গণহত্যা বা পাইকারী হারে প্রাণহানির ঝুঁকি বিরাজ করিতেছে। দেখা যাইতেছে যে, অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক কিংবা অন্য যেকোন কারণেই হউক না কেন, কোন একটি দেশে বিদেশি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বেসামরিক মানুষজনের ব্যাপকহারে প্রাণ হারাইবার মত রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করিয়া ফেলিতেছে। আরও লক্ষণীয় বিষয় এই যে, বিদেশি সামরিক বাহিনী সরকার অথবা বিদ্রোহী পক্ষ যাহাদিগকেই সহায়তা দিক না কেন তাহা কোনভাবেই বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষার বিষয়টি নিশ্চয়তা দিতে পারিতেছে না। উদাহরণস্বরূপ, সামপ্রতিক সময়ে লিবিয়াতে বিদ্রোহীদের পক্ষে এবং মালিতে সরকারের পক্ষে বিদেশি সামরিক বাহিনী কাজ করিয়াছে। উভয় দেশেই ২০১২ সালে বেসামরিক নাগরিকদের জীবনের ঝুঁকি পূর্ববর্তী বত্সরের তুলনায় ভয়াবহ মাত্রাতে বাড়িয়া যাইবার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ একটি আবেদন জানাইয়াছে এমআরজিআই। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে কোন একটি দেশে বিদেশি সামরিক বাহিনী নিয়োজিত করার আগে উক্ত দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত করার শান্তিপূর্ণ উপায়গুলো বিচার-বিবেচনাতে নেওয়াটা একান্ত প্রয়োজন। ভিনদেশি সামরিক বাহিনী নিয়োজিত করার পূর্বে কূটনীতিক চাপ প্রদান, আন্তর্জাতিক সংস্থা হইতে বহিষ্কার, কূটনৈতিক সম্পর্ক কঠিন করিয়া তোলা, অর্থনৈতিক অবরোধ, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, সামরিক বা রাজনৈতিক নেতার আন্তর্জাতিক বিচার, ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, সম্পত্তি জব্দ করিবার মত উপায়গুলি ব্যবহারের পক্ষেও মত দেওয়া হইয়াছে বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে। জানা কথা যে, এমআরজিআই-এর পর্যবেক্ষণে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষেরা নিজেদের মনের কথাই শুনিতে পাইবে। কিন্তু অধুনা এই বিশ্বের দন্ডমুন্ডের কর্তা যাহারা, যাহাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাতে দিকে দিকে যুদ্ধের দামামা বাজিয়া উঠে অথবা আবার অস্ত্রের ঝনঝনানি থামিয়াও যায়, তাহারা কি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় এমআরজিআই এর সুবচনগুলিকে বিবেচনায় আনিবে? সামপ্রতিক বত্সরগুলির ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনাতে লইলে সেই সম্ভাবনা এতটুকুও অবশেষ আছে বলিয়া মনে হয় না।