রা জ নী তি

আমরা কোথায় যাচ্ছি?

আমার স্ত্রী মারা গেছেন আজ ছয়মাসের বেশি হয়ে গেছে। বুড়ো বয়সে স্ত্রীকে হারালে কী ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা জীবনকে ঘিরে ধরে তা এখন মর্মে মর্মে বুঝতে পারছি। আরও বুঝতে পারছি পরনারী কখনো আপন নারী হয় না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “উত্কণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষায় থাকে, সে-ই ধন্য করেছে আমাকে।” আমার জন্য এই উত্কণ্ঠ প্রতীক্ষা ছিলো আমার স্ত্রীর। আমি মধ্যরাতে বাসায় ফিরলেও আমার জন্য উত্কণ্ঠ প্রতীক্ষা ছিলো তার। আমার জন্য পঙ্গু শরীরে হুইল চেয়ারে বসে রান্না করতেন। আমার লেখার টেবিল গুছিয়ে রাখতেন। লন্ডনের এই বাড়িতে আমার চল্লিশ বছরের এই অভ্যাসটি হঠাত্ বিধ্বস্ত হয়ে গেল। তিনি হঠাত্ চলে গেছেন। হঠাত্ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে ভাবছি, গত চল্লিশটা বছরই ছিলো শুধু স্বপ্ন। আজকের এই নির্মম নিঃসঙ্গতাই আমার সারাজীবনের বাস্তবতা। এই বাড়িটা ছিলো আমার নোঙর। সেই নোঙরটা যেন উপড়ে গেছে। আমি ভেসে বেড়াচ্ছি মহাশূন্যতায়। এই নিঃসঙ্গতা, এই মহাশূন্যতা কী যন্ত্রণাদায়ক তা কাউকে বোঝাতে পারবো না। কিছু লেখালেখি করতে পারি বলে সম্ভবতঃ এখনো টিকে আছি। এই বই পড়া আর লেখালেখির মধ্যে নিজেকে কিছুটা ব্যস্ত রাখতে পারি বলেই সম্ভবতঃ এই নিঃসঙ্গতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারছি। প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত ও অপরিচিত জনের টেলিফোন পাই, তারা দেশের দশের খবর দেন। তার মধ্যেও সান্ব্তনা খুুঁজি। শোকার্ত মন আশ্রয় খোঁজে। ইদানিং দেশ থেকেও আর ভালো খবর পাই না। পাঁচ পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ তথা দেশের গণতান্ত্রিক শিবিরের উপর্যুপরি পরাজয়ের খবরে প্রথমে হতাশা বোধ করিনি। ভেবেছি, শেখ হাসিনা ত্রিশ বছরের বেশি সময়ের পোড় খাওয়া একজন রাজনৈতিক নেত্রী। আওয়ামী লীগ প্রায় পৌনে একশো বছর বয়সের একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। যা অবিরাম পতন-উত্থানের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই তার জয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এবারেও হবে। এখন মাঝে মাঝে ভয় হয়, সেই আশাবাদ বুঝি ধরে রাখতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে খুবই সংক্ষিপ্ত দেখা লন্ডনে গত ৭ জুলাই রবিবার শেখ রেহানার বড় মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের বিবাহোত্তর সংবর্ধনায়। তার চেহারা দেখলাম দৃঢ় প্রত্যয়ী। নির্বাচনের পরাজয়ে ভেঙে পড়েননি। আমি মনে মনে বলেছি, আমরা এমন নেত্রীই চাই, যিনি বিজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত হন না, আবার পরাজয়ে ভেঙে পড়েন না। সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে পরাজয়ে শেখ হাসিনা ভেঙে পড়েননি। আশা হল, তার বলিষ্ঠ এবং সংগ্রামী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি এবার দেশে ফিরেই আওয়ামী লীগের দল ও সরকারের মধ্যে ক্ষমতাভোগের অলসতা, স্থবিরতা, আত্মসন্তোষ ও জনবিচ্ছিন্নতা কঠোর চাবুকের আঘাতে দূর করবেন। অকর্মণ্যদের বিতাড়িত করবেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করবেন এবং সংগঠনের মধ্যে ফাইটিং স্পিরিট ফিরিয়ে আনবেন। সবচাইতে বড় কথা, গত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগ তার আদর্শের রাজনীতির যে কেন্দ্রবিন্দুটি থেকে সরে গিয়ে কেবল ক্ষমতার রাজনীতির বৃত্তে জড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে দলটিকে ফিরিয়ে আনার জন্য বলিষ্ঠ ও বাস্তব কর্মসূচি দেবেন। হাসিনা-নেতৃত্বের কাছে আমার এই একটাই প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা তিনি বার বার পূরণ করেছেন। এক-এগারোর বিভীষিকাময় দিনগুলোতেও করেছেন। এবারে সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে বিপর্যয়ের পরও তিনি তা করতে পারবেন অথবা করবেন এটা আমার আশা। কিন্তু বেলারুশ থেকে দেশে ফিরেই যে কাজটি তিনি করেছেন এবং সিটি কর্পোরেশনের বিশেষ করে গাজীপুর নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে প্রায় এক ডজন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের কাছ থেকে যে টেলিফোন বার্তা পাচ্ছি, তাতে মনে আশাবাদ ধরে রাখতে পারছি না। স্ত্রী বিয়োগের যে বিষণ্ন্নতা ও নিঃসঙ্গতা, তার সঙ্গে দেশে আওয়ামী লীগ রাজনীতির হতাশাজনক চিত্র থেকে যে আশঙ্কা যোগ হচ্ছে, অনুমান করি অনেক অতি আশাবাদীরও তা থেকে মনকে মুক্ত করা কঠিন। কিছুদিন ধরেই শুনছিলাম, প্রধানমন্ত্রীর একজন তথ্য উপদেষ্টা নিযুক্ত হবেন। ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর এতোদিনে হুঁশ হয়েছে। তার বর্তমান প্রেস সচিবটি যে একেবারেই অকর্মণ্য, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় সম্পূর্ণ অদক্ষ; কোনো সম্পাদকই তাকে পাত্তা দেন না এবং তিনিও তাদের কোনো প্রকার সম্মান না দেখিয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রায় একঘরে হয়ে আছেন, যা সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য মোটেই সহায়ক নয়, তা সম্ভবতঃ প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পেরেছেন। তাকে সরকারের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার শেষ মুহূর্তে না সরিয়ে একজন দক্ষ এবং সংবাদপত্র মহলে গ্রহণযোগ্য সাংবাদিককে নিজের তথ্য উপদেষ্টা পদে নিযুক্তি দিয়ে সরকার ও সংবাদ মিডিয়ার সুসম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে চান। মনে এই আশাটাই ছিলো। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) সকালে ঘুম থেকে উঠতেই আমার মোবাইল এবং ল্যান্ড দুটি টেলিফোনই ঝনঝন শব্দে বাজতে শুরু করলো। কোন্টা রেখে কোন্টা ধরি। শেষ পর্যন্ত সবগুলো টেলিফোন কলই ম্যানেজ করার পরই বুঝতে পারলাম, এই কল সবগুলোই আওয়ামীপন্থি সাংবাদিক, সম্পাদক এবং কলামিস্টদের। একজন হাসিনা-অন্তঃপ্রাণ-কলামিস্ট ও সম্পাদক প্রায় আর্তকণ্ঠে বললেন, গাফ্ফার ভাই, আমি আর আওয়ামী লীগের পক্ষে কলম ধরতে পারবো না। একেই নিজের মনোবেদনায় ভুগছি, তার উপর অনুজপ্রতিম এক সম্পাদকের আর্তকণ্ঠ শুনে জিজ্ঞাসা করলাম, এমন কি হয়েছে যাতে আপনি আওয়ামী লীগের পক্ষে কলম ধরতে চান না? তিনি বললেন, আপনি শোনেননি, সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রী তার তথ্য উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন? তিনি সাংবাদিক হিসেবে ভালো কি মন্দ, দক্ষ কি অদক্ষ সে প্রশ্ন আমি তুলছি না। কিন্তু অতীতে তিনি গোলাম আজমের নাগরিকত্ব দানকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে কোন্দল পাকিয়ে ক্লাবটিকেও বিএনপি-জামায়াতের হাতে তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ অবজার্ভার পত্রিকাটি ধ্বংস করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বছর বছর জামায়াতের টাকায় হজ করতে যান। এরই পর পর আরো কয়েকজন সাংবাদিক ও কলামিস্ট বন্ধুর টেলিফোন। একজন বললেন, ‘আপনিতো প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা পদে ড. গওহর রিজভিকে যখন আমেরিকা থেকে ডেকে এনে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখনো আপত্তি জানিয়েছিলেন। এখন ঢাকায় কাগজে প্রকাশিত তার সম্পর্কে একটি খবরের দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। খবরটিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভি এবং জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের মধ্যে এক বৈঠক হয়েছে। খবরটা কতোটা সঠিক তা জানি না। এই খবরের কোনো প্রতিবাদ হয়নি। এই খবরের সঙ্গে গোলাম আজমের নাগরিকত্ব লাভের সমর্থক ইকবাল সোবহান চৌধুরীর তথ্য উপদেষ্টা পদে নিযুক্তির খবরটি মিলিয়ে দেখুন, তারপর আমাদের বলুন, দেশ কোথায় যাচ্ছে, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমাদের এখন করণীয় কি? এই প্রশ্নের জবাব আমি কি দেব? আমি বাংলাদেশ থেকে বহুদূরে থাকি, একজন নগণ্য সাংবাদিক। আমার কোনো রাজনৈতিক প্রভাব নেই, যে প্রভাবের বলে প্রধানমন্ত্রীকে কোনো পরামর্শ দিতে পারি বা তিনি তা শুনবেন? আমি তাকে বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে স্নেহ করি, সম্মান করি। তিনিও আমাকে করেন। আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি বঙ্গবন্ধুর দল হিসেবে। এই দল এখনো স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শের পতাকাবাহী। এই আদর্শ থেকে দলটির বা নেত্রীর বিচ্যুতি দেখলে তাতে মর্মাহত হই, আপত্তি জানাই। কিন্তু আমার একশ্রেণির বন্ধুর মতো বলতে পারি না যে, আওয়ামী লীগকে আর সমর্থন দেব না। কারণ, তাহলে কাকে সমর্থন দেব? আওয়ামী লীগ ও হাসিনা নেতৃত্বের কোনো বিকল্প এখনো আমার চোখে পড়ছে না। আমার এই লেখাটিও তাই ক্ষমতাসীন দল ও প্রধানমন্ত্রীকে সতর্কীকরণ। তাদের কোনো সমালোচনা নয়। প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে বলি, জনমত ভ্রান্ত হলেও তাকে উপেক্ষা দেখাতে নেই। সেই পৌরাণিক যুগেও রাম শুধুমাত্র জনমতকে তুষ্ট করার জন্য সীতাকে ত্যাগ করেছিলেন। অগ্নি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সীতাকে ঘরে ফিরতে হয়েছিলো। আমার মনে হয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে ড. গওহর রিজভিকে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা পদে, সম্প্রতি শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে বসানো এবং এখন ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে তথ্য উপদেষ্টা পদে নিয়োগ শুধু সাধারণ জনমতকে নয়; আওয়ামী লীগ সরকারের পরীক্ষিত বন্ধু, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও বিরাটভাবে মনঃক্ষুণ্ন করেছে। মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নিজের খেয়ালখুশি মতো যা ইচ্ছা তাই করতে চান, তার প্রকৃত বন্ধু ও হিতৈষীদের কোনো কথাও শুনতে নারাজ। ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে নিয়ে এতো বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তাকে তথ্য উপদেষ্টা পদে নিয়োগ শুধু আওয়ামী লীগের সমর্থক দু’একজন সাংবাদিককে নয়, দল ও সরকারের এই দুঃসময়ে দেশের মিডিয়া জগতে যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাংবাদিক, সম্পাদক ও কলামিস্ট এখনো সব ভয়ভীতি ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে আওয়ামী লীগ ও হাসিনা নেতৃত্বকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। তারা আমাকে তাদের দুঃখের কথা জানিয়েছেন। আমি সমবেদনা জানানো ছাড়া আর কি করতে পারি? জানি না, প্রধানমন্ত্রী তার সুদিন-দুর্দিনের একনিষ্ঠ সমর্থনদানকারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অধিকাংশের মনোভাব ও ইচ্ছাকে কিছুমাত্র সম্মান দেখালেন না কেন? ড. গওহর রিজভি, শিরীন শারমিন চৌধুরী বা ইকবাল সোবহান চৌধুরী কারো সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খারাপ নয়। বরং তাদের আমি সম্মানের চোখে দেখি। ড. গওহর রিজভি বেশ কয়েক বছর আগে যখন অক্সফোর্ডে ছিলেন, তখন তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ আমার হয়েছে। বাংলাদেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে লন্ডনে আমরা তখন অনেকেই সক্রিয়। তিনি আমাদের সমর্থনে কাজ করতে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তার হাবভাব, মতিগতি আমাদের অনেককেই সন্দিগ্ধ করে তুলেছিলো। মনে হয়েছিলো, তিনি একজন ক্ষুদে ড. কামাল হোসেন। তার সম্পর্কে আমাদের এই মনোভাব পরিবর্তনের কারণ কখনো ঘটেনি। শিরীন শারমীন চৌধুরী আমার বন্ধুকন্যা। তার বাবা প্রয়াত রফিকুল্লা চৌধুরী ছিলেন আমার সহপাঠী এবং একই রাজনৈতিক মতানুসারী। তার কন্যা আমার নিজের কন্যার মতো। শিরীন কেবল সংসদের স্পিকার হওয়া কেন, কোনোদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও আমার আনন্দের (যদি ততোদিন বেঁচে থাকি) অন্ত থাকবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে সরাসরি নির্বাচিত একজন এমপি হওয়ার আগে, স্পিকার পদে বসার সংসদীয় অভিজ্ঞতা ও ম্যাচুরিটি লাভের আগে সহসা তাকে স্পিকার পদে বসানো কতোটা সঙ্গত হয়েছে তা আমি জানি না। তাকে প্রথমে ডেপুটি স্পিকার পদে বসিয়ে অভিজ্ঞতা ও ম্যাচুরিটি অর্জনের সুযোগ দিলে তার প্রতি ন্যায়বিচার করা হতো এবং দলে যে দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ও প্রবীণ সদস্য রয়েছেন, তাদের কাউকে স্পিকারের পদ দেওয়া হলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের ভেতরে অপ্রকাশ্য অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতো না। ইকবাল সোবহান চৌধুরী সম্পর্কে আর নতুন কী বলবো? তিনিও আমার পরিচিত এবং আপনজন। তার সঙ্গেও আমার কোনো বিরোধ নেই। বরং ভালো সম্পর্ক। কিন্তু তার নীতি ও মতিগতি সম্পর্কে আমি সন্দিহান। সাংবাদিকদের সরকারি জমি পাওয়ার ব্যাপারে বিএফইউজে’র সভাপতি হিসেবে কিভাবে তার বিরুদ্ধে যথেচ্ছাচার, বহু সাংবাদিকের জমি না পাওয়া এবং বহু অসাংবাদিকের জমি পাওয়া সম্পর্কে যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, তার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। নিজের নেতৃত্বের স্বার্থে সাংবাদিক ইউনিয়নকেও তিনি দ্বিখন্ডিত করেছেন বলে বাজারে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক হিসেবে তিনি যতোই দক্ষ হোন, তিনি কি করে মিডিয়ার সঙ্গে এই সরকারের হারানো সম্পর্ক আবার ফিরিয়ে আনবেন? প্রধানমন্ত্রী যদি তার তথ্য উপদেষ্টার নীতি ও চরিত্র বিচারই না করবেন, তাহলে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকে এই পদটা অফার করলে ক্ষতি কি ছিলো? আগেই বলেছি, স্ত্রীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গতা এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা দুই মিলে যে মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছি তা কাউকে লিখে বোঝাতে পারবো না। তার উপর জুটেছেন আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির এমপি। গুণে দেখেছি তাদের সংখ্যা এক ডজনের কম হবে না। রোজ তারা টেলিফোন করেন। তাদের কথা, “এবার নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা আমাদের নেই। নেত্রীকে বলুন এবং আপনার কলামে জোর ভাষায় লিখুন। হেফাজতিদের সঙ্গে নেত্রী একটা আপস করে ফেলুন। মওলানা শফীকে আলোচনার জন্য হেলিকপ্টারে চড়িয়ে গণভবনে নিয়ে আসা হোক।” আমি রাগ সামলাতে পারিনি। তাদের একজনকে বলেছি, আপনারা বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের অসম্মান। ’৭১ সালের আওয়ামী লীগে দলীয় এমপিএ ও এমএনএ’রা ছিলেন সংগ্রামী এবং নীতিনিষ্ঠ। বঙ্গবন্ধুর ডাকে তারা হাতে যুদ্ধের অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন এবং এক বস্ত্রে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবাসে সরকার গঠন করেছিলেন। আপনারা, বর্তমানের অধিকাংশ এমপি নীতিনিষ্ঠ নন, সংগ্রামীও নন। আপনারা অনেকেই জনবিচ্ছিন্ন দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী। জনগণ বা ভোটারদের সম্মুখীন হওয়ার সাহস আপনাদের নেই। সংগ্রামে নামার ইচ্ছা নেই, আগ্রহও নেই। নির্বাচন সামনে আসতেই হেফাজতিদের পায়ে কুর্নিশ করে হলেও আপনারা আবার এমপি হতে চান। অর্থাত্ এভাবেই এমপি হওয়া সহজ হবে ভাবছেন। আপনাদের সঙ্গে বিএনপি’র এমপিদের পার্থক্য কি তা আমাকে বোঝাতে পারেন? আমি এদের আরও বলেছি, ’৭১ সালে আপনারা যদি আওয়ামী লীগের এমপি হতেন, তাহলে মুক্তি সংগ্রামের বদলে বঙ্গবন্ধুকে ইয়াহিয়ার সঙ্গে আপস করে ফেলার জন্য অনুরোধ জানাতেন। বলতেন, ক্ষমতায় যাওয়ার এটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের জন্য সবচাইতে সহজ ও নিরাপদ পথ। জাতির পরম সৌভাগ্য, আপনারা নব্যধনী এবং নব্য ব্যবসায়ীরা তখন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন না। দুঃখ বলি কারে? মনের বেদনা ও যন্ত্রণা প্রকাশের জন্য এই লেখাটা লিখলাম। লেখাটা শেষ করে এনেছি এমন সময় খবর পেলাম হেফাজতি নেতা মওলানা শফী নারীদের সম্পর্কে যে অশালীন ও অজ্ঞতাপ্রসূত উক্তি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রতিবাদ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ শুধু প্রতিবাদ নয়, এই ধরনের ধৃষ্ট উক্তির প্রতিকার করুন। জামায়াতিদের মতো হেফাজতিদেরও বিষদাঁত গজাতে দেবেন না। [ লন্ডন ১৩ জুলাই, শনিবার, ২০১৩ ]