প্রকৃতি
ও রে কর্ণফুলী রে...
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৩, ২৩:১১
সত্য সাহা পরিচালিত সাম্পানওয়ালা ’৭০ দশকের আলোচিত ছবি। ছবিটি প্রশংসা পেয়েছিল খুব। ‘ও রে কর্ণফুলী রে সাক্ষী রাখিলাম তোরে/অভাগিনীর দুঃখের হথা হবি বন্ধু রে’—গানটি ছিল মানুষের মুখে মুখে। গানটিতে তখন কণ্ঠ দিয়েছিলেন সঞ্জিত আচার্য ও কান্তা নন্দী। এই কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, চলচ্চিত্র, নাটক। কারণ এক কথায় বলতে গেলে চট্টগ্রামের প্রাণপ্রবাহ এই কর্ণফুলী।
ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে শুরু হয়ে ৩২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গার কাছে এসে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরটিও কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। তাই সবারই স্বীকার করতে হবে এই নদীর প্রয়োজনীয়তা। কর্ণফুলী শুধু চট্টগ্রামের অহংকার নয়, অহংকার পুরো বাংলাদেশের। হাজার বছরের এই নদী দেশকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেনি, দেশের প্রাণপ্রবাহ টিকে থাকার জন্য সাহায্য করেছে। অথচ অসচেতনতার কারণে আমরাই এই নদীকে প্রতিনিয়ত দখল, দূষণ আর ভরাট করে চলেছি। নদীর দু’পাশে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানার তরল ও কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে নদীর পানিকে করে তুলেছি বিষাক্ত। কর্ণফুলী নদীর সাথে সংযুক্ত রয়েছে বেশ কয়েকটি খাল। এসব খালের মাধ্যমে শিল্পবর্জ্য সরাসরি পড়ছে কর্ণফুলীতে। শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, পয়োবর্জ্য, নৌযান-জাহাজের পোড়া তেলসহ অন্যান্য বর্জ্য প্রতিনিয়ত মারাত্মকভাবে দূষিত করছে নদীর পানিকে। এভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে কর্ণফুলী।
একটি দেশের প্রাণপ্রবাহ বলা চলে নদীকে। নদী না বাঁচলে সে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে পরিচালিত হয় না, জীববৈচিত্র্যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। নেমে আসে বিপর্যয়। আর এই উপলব্ধিটা সবার ভেতরেই থাকা প্রয়োজন। আমাদের সুন্দর আগামীর জন্য দেশের প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। আর তারই অংশ হিসেবে তরল বর্জ্যের আধারে পরিণত হবার আগে কর্ণফুলীকে যৌবনে ফিরিয়ে দিতে ২০১১ সালের মে মাস থেকে ২২৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সদরঘাট থেকে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু এলাকা পর্যন্ত নদীতীরের ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ও অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। চলছে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকার সংস্করণ ও নদীতীর সংরক্ষণের কাজ।
সদরঘাট থেকে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু এলাকা পর্যন্ত নয়টি অঞ্চলে ভাগ করে ন্যূনতম ৭০ মিটার থেকে ১৭৪ মিটার পর্যন্ত নদীর প্রশস্ততা বাড়ছে। প্রকল্প এলাকার গড়ে নদীর প্রশস্ততা ছিল ৬৪৫ মিটার, যা বেড়ে দাঁড়াবে ৭৭৫ মিটারে। পাশাপাশি নদীর গভীরতা বাড়বে চার মিটার। প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও বাকি রয়েছে আরও অনেক। কাজ শেষ হলে কর্ণফুলী হারানো যৌবন ফিরে পাবে বলে আশা করা যায়।
সভ্যতার ইতিহাস নদীকেন্দ্রিক। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, বড় বড় শহর গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। স্বল্প খরচে সহজ ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থাই এর অন্যতম কারণ। বুড়িগঙ্গার কোলে ঢাকা, কর্ণফুলীর কোলে চট্টগ্রাম, সুরমার কোলে সিলেট, পদ্মার কোলে রাজশাহী, শীতলক্ষ্যার কোলে নারায়ণগঞ্জ আর রূপসার কোলে খুলনা শহর গড়ে উঠেছে। তাই কর্ণফুলীর সাথে সাথে দেশের অন্যান্য নদীসহ সকল জলাধার সংস্কার ও সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। নদীমাতৃক একটি দেশের জন্য নদীকে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন