একনজরে আমাদের জেলা
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫৯
হিমালয়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত দেশের সর্ব উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও। ঠাকুরগাঁও এর আদি নাম ছিল নিশ্চিন্তপুর। ‘নিশ্চিন্তপুর’-নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিশ্চিন্তে বসবাসের উপযোগী কোনো গ্রাম বা জনপদের ছবি। কিংবা মনে পড়ে যায় বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাসের ‘নিশ্চিন্দিপুর’ গ্রামের কথা। কিন্তু কখনো মনে পড়ে না উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের কথা। কেননা অনেকদিন আগেই চাপা পড়ে গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের এই নিশ্চিন্তপুর নামটি। কয়েকজন বিত্তশালী মানুষের খোয়ালী ইচ্ছাকে পূরণ করতে সাধারণের প্রিয় জনপদ নিশ্চিন্তপুরকে পাল্টে করা হয় ঠাকুরগাঁও। আর এ ইতিহাস অজানা রয়েছে বলে নিশ্চিন্তপুর শব্দটি উচ্চারিত হলে কখনো ঠাকুরগাঁওয়ের কথা মনে হয় না। তবে ইতিহাস সচেতন মানুষ আজো আবেগ শিহরিত হূদয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে নিশ্চিন্তপুরের কথা মনে করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের নাম যে নিশ্চিন্তপুর ছিল তার তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এতদিন আমাদের হাতের কাছে ছিল না। জনশ্রুতি ও মৌজার নাম নিশ্চিন্তপুর হওয়ায় অনুমান করা হতো ঠাকুরগাঁও সম্ভবত এক সময়ে নিশ্চিন্তপুর নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি একটি মানচিত্র আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ঠাকুরগাঁওয়ের আদি নাম ছিল ‘নিশ্চিন্তপুর’। ১৭শ শতাব্দীর কোচবিহারের মানচিত্রে সংলগ্ন এলাকার যে অবস্থান দেখানো হয়েছে তাতে ঠাকুরগাঁও ও নিশ্চিন্তপুর নামে দু’টি আলাদা জায়গা চিহ্নিত রয়েছে। টাঙ্গন নদীর পূর্ব প্রান্তে দেখানো হয়েছে নিশ্চিন্তপুর এবং এরই কিছুটা উত্তর-পশ্চিমে টাঙ্গন নদীর পশ্চিম প্রান্তে দেখানো হয়েছে ঠাকুরগাঁও। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, টাঙ্গন নদীর পূর্ব প্রান্তের নিশ্চিন্তপুরকেই পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও নাম দিয়ে সদরের নামকরণ করা হয়। আর এর মাধ্যমেই নিশ্চিন্তপুর রূপান্তরিত হয় ঠাকুরগাঁওয়ে। প্রথমে সমগ্র মহকুমা পরিচিত হয় ঠাকুরগাঁও নামে এবং পরে এরই ধারাবাহিকতায় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের পরিচিতি।
ঠাকুরগাঁওয়ের নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে আর যা পাওয়া গেছে তা হলো, বর্তমানে যেটি জেলা সদর অর্থাত্ যেখানে জেলার অফিস-আদালত অবস্থিত সেখান থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে আকচা ইউনিয়নের একটি মৌজায় নারায়ণ চক্রবর্তী ও সতীশ চক্রবর্তী নামে দুই ভাই বসবাস করতেন। সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে তারা সেই এলাকায় খুব পরিচিত ছিলেন। সেখানকার লোকজন সেই চক্রবর্তী বাড়িকে ঠাকুরবাড়ি বলতেন। পরে স্থানীয় লোকজন এই জায়গাকে ঠাকুরবাড়ি থেকে ঠাকুরগাঁও বলতে শুরু করে। চক্রবর্তী বাবুরা এখানে একটি থানা স্থাপনের প্রয়োজন অনুভব করেন। তাদের অনুরোধে জলপাইগুড়ির জমিদার সেখানে একটি থানা স্থাপনের জন্য বৃটিশ সরকারকে রাজি করান। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে এখানে একটি থানা স্থাপিত হয়। আর তার নাম দেওয়া হয় ঠাকুরগাঁও থানা। পরবর্তীতে নানা কারণে টাঙ্গন নদীর পূর্বতীরে নিশ্চিন্তপুরে ঠাকুরগাঁও থানা স্থানান্তরিত হয়। আর এই থানাকে কেন্দ্র করে ১০টি থানা নিয়ে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঠাকুরগাঁও মহকুমা গঠিত হয়। বর্তমান পঞ্চগড় জেলার ৫টি থানাই তখন ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্গত ছিল। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১লা ফেব্রুয়ারি ৫টি থানা নিয়ে এই ঠাকুরগাঁওয়ের নাম বাংলাদেশের মানচিত্রে চিহ্নিত হয় জেলারূপে। জেলারূপে নতুন হলেও জনপদ হিসেবে ঠাকুরগাঁওয়ের রয়েছে এক সুপ্রাচীন ইতিহাস।
১৮ হাজার ৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ জেলার উত্তরে পঞ্চগড়, পূর্বে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা, দনি ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য অবস্থিত ।প্রাচীন কালে এ জেলা ছিল পুন্ড্রবর্ধন জনপদের অংশ।
এ জেলাতেই জোরদারভাবে সংগঠিত হয়েছিল তেভাগা আন্দোলন। আন্দোলন নস্যাত্ করতে জেলা সদরের একটি বিশাল মিছিলে বৃটিশ সরকারে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ৩৫ জন আন্দোলনকারী।
ঠাকুরগাঁও এর প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম রাজা টংকনাথের বাসভবন। এটি রানিশংকৈল জমিদারবাড়ী নামেও পরিচিত । বৃটিশ সরকারে কাছ থেকে রাজা উপাধি পান জমিদার টংকনাথ। তারপর থেকে এটি রাজবাড়ী নামে পরিচিত। রানিশংকৈল থানার পূর্বপাশে কুলিক নদীর তীরে মালদুয়ারে রাজা টংকনাথের রাজবাড়ী। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে নির্মিত হয় এ রাজবাড়ী । রাজবাড়ী নির্মাণের কাজ শুরু করেন জমিদার বুদ্ধিনাথ চৌধুরী । আর শেষ করেন রাজা টংকনাথ চৌধুরী । বর্তমানে ধ্বংসের শেষপ্রান্তে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ রাজবাড়ীটি। তিনতলা এ রাজবাড়ী এখন পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ। রক্ষণাবেক্ষণ করার কেউ নেই । পশ্চিমে সিংহদরজা । দরজার চূড়ায় দিকনির্দেশক হিসাবে লোহার রডে এস.এন.ই.ডাঝ.ঘ.ঊ.ড চিহ্ন অঙ্কিত আছে । রাজবাড়ীর উত্তর-পূর্ব কোণে কাছারিবাড়ী অবস্থিত । এখানে বসেই রাজা টংকনাথ তার রাজকার্য পরিচালনা করতেন । পূর্বদিকে রয়েছে দুটি পুকুর ।
ঠাকুরগাঁও জেলায় রয়েছে দেশের সবচাইতে বড় আম গাছ । বালিয়াডাঙ্গী থানার মন্ডমালা গ্রামে আমগাছটি অবস্থিত । গাছটির নাম সূর্যপুরি আমগাছ । অসংখ্য শাখাপ্রশাখা নিয়ে গঠিত আমগাছটি দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটি আম বাগান । তিন একর জমি জুড়ে রয়েছে এ ্রকান্ড আমগাছটি। গাছটির বেড় ২০ বান । মন্ডুমালা গ্রামের সাইদুর রহমান গাছটির মালিক। গাছটিতে এখনো আমের প্রচুর ফলন হয় ।
ঠাকুরগাঁয়ের সুফি সাধকদের মধ্যে সৈয়দ নাসির উদ্দিন শাহ অন্যতম । বার শতকের শেষে অথবা তের শতকের শুরুতে তিনি এ অঞ্চলে আগমন করেন । বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচার করার পর তিনি স্থায়ীভাবে খানকাহ স্থাপন ভবানন্দপুর গ্রামে । আর এখান থেকেই তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন । তার সদস্বভাব, চারিত্রিক মাধুর্য এবং ধর্মপরায়ণতায় মুগ্ধ মুরিদরা তাকে ‘নেকবাবা’ বা ‘নেকমরদ’ বলে ডাকতেন । এরপর তারপ্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এলাকার নামকরণ করা হয় নেকমরদ। এখন এলাকাটি নেকমরদ নামেই পরিচিত।