খাদ্য নিরাপত্তা বিল

ভারতে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের কৌশল!

ভারতের শিশুদের প্রায় অর্ধেকই অপুষ্টির শিকার। এই সমস্যা সমাধানে ভারত ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে সস্তায় খাদ্য সরবরাহের পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আয় থাকা সত্ত্বেও ভারতের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টা এখনো অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, গ্লোবাল হাঙ্গার সূচকে ৭৯টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান হচ্ছে ৬৫। ভারত সরকারের নিজস্ব হিসাবে, ভারতে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় অর্ধেক শিশু অপুষ্টির শিকার। ২০০৫-২০১০ সাল পর্যন্ত অপুষ্টি ও কম ওজনের শিশুদের সংখ্যার দিক থেকে ১২৯টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। একদশক পূর্বের জরিপে দেখা গেছে, তখন ভারতের শতকরা ৩৬ ভাগ শিশু জন্মেছে কম ওজন নিয়ে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং জেন ড্রেজ বলেন, ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে নারী ও শিশুর খাদ্য নিরাপত্তায় অনগ্রসরতা। যা শুধু ভারতের বর্তমান প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ভবিষ্যত্ প্রজন্মের মধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। অপুষ্টি সমস্যা সমাধানে ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সোয়া এক লাখ রুপির প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর জন্মবার্ষিকীতে এই কর্মসূচি উদ্বোধন করা হবে। এজন্য খাদ্য নিরাপত্তা বিল তৈরি করা হয়েছে। কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বাস করে, এই বিলের লক্ষ্য দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি রোধ ও ক্ষুধা-দারিদ্র্যের মোকাবেলা করা। খাদ্য নিরাপত্তা বিল নিয়ে কংগ্রেসকে প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এই বিলের লক্ষ্য হচ্ছে শহর ও গ্রাম পর্যায়ে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের জন্য সারাবছর ধরে ৫ রুপি দরে চাল ও ২ রুপি কেজি দরে আটা দেয়া হবে। প্রতিমাসে ৩ থেকে ৭ কেজি করে খাদ্যশস্য দেয়া হবে। এছাড়া সন্তানসম্ভবা নারীদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি ৬ মাস বয়স থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশুরা বিশেষ করে পুষ্টিহীন শিশু ও হতদরিদ্র,সহায়-সম্বলহীন লোকজন এই বিলের আওতায় সুবিধা পাবে। এটা ভারতের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর বা সুখকর তা অনেকেই মানতে চান না। কিছু সমালোচকের মতে, এই খাদ্য নিরাপত্তা বিল প্রকল্প ভারতের সাধারণ জনগণের তেমন কোন উপকারে আসবে না। এই সমালোচনার পর একটি প্রশ্ন বারবার চলে আসে, তা হলো “আর্থিক নিরাপত্তা বনাম ক্ষুধার্ত মানুষের প্রশ্ন”। তবে সমালোচনার একটি কারণ হলো রেশনের দোকান মালিকদের দুর্নীতি। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিভিন্ন রেশনের দোকান মালিকরা ৩৭-৫৫ ভাগ ভর্তুকির চাল, গম ইত্যাদি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়। সমস্ত দোকান মালিক এই বিলের আওতায় অধিক পরিমাণ খাদ্য বিতরণ করলে তারা আরো বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের সনাক্ত করা একটি বড় সমস্যা। যাই হোক এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের ৬০ মিলিয়ন টন খাদ্য মজুদ দরকার। চলতি বছর ভারতের সরবরাহকৃত খাদ্যের পরিমাণ ৯০ মিলিয়ন টনের অধিক হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন এত বাড়তি খাদ্য কোথায় যাচ্ছে? জরাজীর্ণ গুদাম ও খোলা স্থানে খাদ্য সরবরাহ এই খাদ্য ঘাটতির জন্য বহুলাংশে দায়ী। জেন ড্রেজ ও অমর্ত্য সেন বলেন, এটি একটি ক্ষুধাপীড়িত দেশের জন্য জঘন্যতম ঘটনা। অন্য সমালোচকরা বলেন, এর মূল কারণ হচ্ছে সরকারের উদাসীন খাদ্যনীতি। যদিও সরকার কৃষকদের কাছ থেকে অধিক মূল্যে খাদ্যশস্য ক্রয় করে থাকে, যা খাদ্য উত্পাদনে উত্সাহ বাড়ায়। তাই বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তা বিলকে অনেক সমালোচকই ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। ইতিমধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দরিদ্র লোকদের মাঝে সস্তায় খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ জয়তি ঘোষ বলেন, সার্বজনীন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এই বিল যথেষ্ট নয়, এক্ষেত্রে সরকারের উচিত কৃষি উত্পাদনে ভর্তুকির বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা বিলকে সরকার যতই ম্যাজিক পিল ভাবুক না কেন, এই বিল পাস করাই সঠিক সমাধান নয়, এর সঠিক বাস্তবায়নই হচ্ছে আসল কথা।