ঋণ সংকট ঘনীভূত হচ্ছে ইউরোপে
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২০:৩৫
ইউরোপকে বলা হয় শিল্পোন্নত অঞ্চল। পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ইউরোপকে মডেল হিসেবে মনে করে। কিন্তু এই ইউরোপীয় অঞ্চলের এখন যে দুর্দশা তা দেখে অনেকে আক্ষেপ করতে পারেন। বিশেষ করে ক্রমাগত অর্থনৈতিক মন্দার মুখে ইউরোপের অনেক দেশের কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশগুলোর বেকারত্ব। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সারা ইউরোপ জুড়ে ঘুরেফিরে অনেকে চাকরি নামক সোনার হরিণের দেখা পাচ্ছেন না। শিক্ষাজীবন শেষ করে অনেকে বেকার তো থাকছেনই যারা আগেই চাকরি করতেন তাদের অনেককে কোম্পানিগুলো ছাটাই করায় বেকারত্বের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি সম্প্রতি ইউরোপের ঋণ সমস্যা নিয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তা থেকে একটি উদাহরণ টানলে ইউরোপের বর্তমান অবস্থা অনেকের কাছে পরিস্কার হবে। সম্প্রতি ইতালির রোমে দেশটির নির্মাণ শিল্পের মালিকরা বার্ষিক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। নির্মাণশিল্প দেশটির মোট দেশজ উত্পাদনের ১৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। একটি কোম্পানির কর্ণধার ঐ সম্মেলনে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির নির্মাণশিল্পে এতবড় সংকটের সৃষ্টি হয়নি। শুধুমাত্র গত দুই বছরে এখাত থেকে ৬ লাখ ৯০ হাজার লোক চাকরি হারিয়েছে।
এতো গেলো চাকরির কথা। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলোর আরো একটি সংকট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। সেটি হলো দেশগুলোর ঋণ সংকট। অনেক দেশ ঋণভারে এমনটাই জর্জরিত হয়েছে যে, এ থেকে দেশগুলো কবে উদ্ধার হবে তা অনেকের অজানা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা সময়ে অর্থের যোগান দিয়ে দেশগুলোকে ঋণের বোঝা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু খুব বড় ধরনের কোন উদ্যোগ না থাকায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গ্রিস, পর্তুগাল, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ইতালির মতো দেশগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া কিছু ছোটখাটো দেশ তো আছেই। সম্প্রতি ইউরোপের একটি দেশ অর্থ বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলটি বন্ধ করে দিয়েছে। এ নিয়েও সেখানে আন্দোলন হয়েছে। মোদ্দা কথা হলো ইউরোপের ঋণ সংকট খুব দ্রুত কাটছে বলে মনে হয় না।
এবার বিষয়টির একটু পেছনে আসা যাক। ইউরোপের দেশগুলোর ঋণসীমা কি পর্যায়ে থাকবে তা নির্ধারণ করতে দেশগুলো ১৯৯২ সালে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এ চুক্তির ফলে কোন দেশ নিজের ইচ্ছেমতো ঋণ নেয়া বা খরচ করতে পারতো না। ২০০০ সাল পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন অসুবিধা দেখা যায়নি। সরকারগুলোর আয় কমে যাবার কারণে তারা ব্যাপকহারে ঋণগ্রহণ করতে থাকে। কোন নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে অনেকে ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকেও ঋণ নেয়। এরপর থেকে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হতে থাকে। বাজেট ঘাটতি কমিয়ে এনে ঋণের অর্থ কমিয়ে আনার জন্য দেশগুলোকে ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে তাগিদ দেয়া হলেও তাতে কাজ হয়নি। ইউরোপের দেশেগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে আসে ২০০৯ সাল। এসময় রাষ্ট্রীয় বন্ডগুলোর ওপর বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারায়। এদিকে, বন্ডগুলো বিক্রি না হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থের ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে যেসব শিল্প ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে সেগুলোর অবস্থা চরমে পৌঁছে। বিশেষ করে আবাসন শিল্পের অবস্থা হয় শোচনীয়। এ খাতের ব্যবসায়ীরা প্রচুর ফ্ল্যাট তৈরি করে রাখলেও সেগুলো বিক্রি হচ্ছে না। এ নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তাও কম নয়। সর্বপ্রথম দুশ্চিন্তা খোলামেলাভাবে ধরা দেয় স্পেন থেকে। দেশটির সরাকার ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকে বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানায় আবাসন খাতে বিনিয়োগ করার জন্য। স্পেনে এখন যে কেউ মাত্র একটি ফ্ল্যাট কিনে দেশটির রেসিডেন্স পারমিট নিতে পারেন। ২০১০ সালে পরিস্থিতি আরো জটিল হলে অন্য দেশগুলোর টনক নড়ে। ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো দেশগুলো সংকটে পড়া দেশগুলোকে টেনে তোলার জন্য আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। স্বতন্ত্র বন্ড বিক্রি না হওয়ার কারণে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তা দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে।