চরদখল ও চরবাণিজ্য রোধে চাই আইনের প্রয়োগ

নদীমাতৃক এই দেশে নদীর এই কূল গড়িয়া উঠে তো ওই কূল বিলীন হইয়া যায় নদীগর্ভে। তারপর কোনো এক সময় হয়তো বিলীনভূমি আবার ফিরিয়া আসে। দেশের প্রধান প্রধান নদীবক্ষেও অসংখ্য স্থান রহিয়াছে যেইখানে ভূমি জাগিয়া উঠে শুষ্ক বা শীত মৌসুমে, বর্ষা আসিলে সেই চর আবার ডুব দেয় নদীবক্ষে। সকল প্রকার চর লইয়া দখলবাজি ও ভূমিবাণিজ্য এই দেশের চিরাচরিত ঘটনা। সুনির্দিষ্ট আইন রহিয়াছে চরের ভূমি লইয়া, তাহার পরও চর লইয়া বেআইনি দখলদারি ও বাণিজ্য আমরা আকছার দেখিতে পাই। আমাদের সীমিত ভূমি ও জনসংখ্যার অতি ঘনত্বের কারণে লাখ লাখ ভূমিহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাধ্য হয় চরেই ভাঙা-গড়ার জীবন গ্রহণ করিতে। সমস্যা হইল তাহাদের সহিত ধান্ধাবাজ মতলববাজরা আইনের তোয়াক্কা না করিয়া চরের উর্বর ভূমিতে ফোটায় যত প্রকারের বিষফুল। বিচিত্র সব চরে কত মানুষ বসবাস করে, তাহার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকিলেও বিভিন্ন সূত্র হইতে ধারণা করা হয় চরে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা ৫০ হইতে ৬০ লাখ। এই সকল মানুষের ভিতরে ৯৩ শতাংশই ভূমিহীন প্রায়, এবং ৬০ শতাংশ মানুষ পুরোপুরি ছিন্নমূল। তাহাদের কাহারোই নিজস্ব মালিকানায় কৃষিজমি বা বসতভিটা নাই। ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে এই দেশে যেই দ্বীপচর এবং মূল ভূমির সহিত সন্নিহিত চর রহিয়াছে, তাহারা স্থায়িত্ব অনুযায়ী স্থায়ী বা পুরোনো চর এবং অস্থায়ী বা ভাঙনপ্রবণ চর হিসাবে বিবেচিত হয়। নদীর তীর ছাড়াও নদীবক্ষে জাগিয়া উঠা ছোট-বড় চরের সংখ্যা বিপুল। তাহাদের ভিতরে কোনো কোনো চরের জমিতে যেমন মানুষের বসতি গড়িয়া উঠিয়াছে, তেমনি কোনো কোনো চরের উর্বর জমিতে শুধু চাষবাস করিতে দেখা যায়। আবার একেবারেই বসতিবিহীন অসংখ্য দুর্গম চরের অস্তিত্বও রহিয়াছে। যেইহেতু চরের ভূমি ব্যক্তিমালিকানায় পাওয়া সম্ভব নয়, তাই কোনো চর অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক সম্ভাবনাময় হইলে সেইখানে লিজ ও দখলবাণিজ্যের দাপট বাড়িয়া যায়। সব সরকারের আমলেই ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করিয়া সর্বাধিক অন্যায়-অনিয়মের চর্চা ও প্রতিপালন আমরা দেখিয়া থাকি এই সকল বেআইনি কাজে। সরকারি কিংবা বিরোধপূর্ণ জমির জাল কাগজপত্র তৈরি করিয়া আইনি জটিলতার আড়ালে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে দেখা যায় এক শ্রেণীর প্রভাবশালীদের। তাহারা প্রচলিত আইন ও নিয়ম-কানুনের কোনো তোয়াক্কাই করে না। অন্যদিকে আইনের কারণেই ভূমিহীন বা ছিন্নমূল অতিদরিদ্র চরবাসীরা প্রায় সব ধরনের নাগরিক অধিকার হইতে বঞ্চিত। আজীবন প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত হওয়ার কারণে দুঃখ-কষ্ট-বঞ্চনার মাত্রাও তাহাদের সর্বাধিক। প্রায় সারা বত্সরই বিভিন্ন চর এলাকায় নদীভাঙন, বালুঝড়, বন্যা, খরাসহ কোনো না কোনো ধরনের দুর্যোগ লাগিয়া থাকে। উদাহরণ দিয়া বলা যায়, পাবনার বেড়া উপজেলার যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরসমূহে প্রায় ৩০ হাজার নারী ও শিশু মানবেতর জীবন যাপন করিতেছে। আমরা মনে করি, চর লইয়া সকলপ্রকার বেআইনি কার্যকালাপ বন্ধ না হইলে প্রায় অর্ধ কোটি চরবাসীর ন্যূনতম সুফলটুকুও অধরা থাকিয়া যাইবে। প্রকৃত ছিন্নমূল ভূমিহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠী লিজ পাইতেই পারে চরের ভূমিতে, কিন্তু তাহা লইয়া বেআইনি বাণিজ্য ও ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালীদের মধ্যস্বত্ব ভোগের ব্যবস্থা বহাল রাখিবার অবকাশ নাই। তাহা অন্যায় ও অমানবতার শেকড়েই জলসিঞ্চন করে। প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগেই তাহা সম্ভব। শুধু দরকার যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা। আইন যেহেতু আমাদের জীবনে সুরক্ষা আনয়ন করিতে, শৃঙ্খলাবদ্ধ করিতে ও অব্যবস্থাপনাকে হটাইয়া দিতে সাহায্য করে, সেহেতু তাহার প্রতি চোখ উল্টাইলে দেশের উন্নয়নও উল্টাইয়া যায়। ইহা স্মরণ রাখা সকলের জন্য জরুরি।