মংলায় পশুর নদী খনন প্রক্রিয়া শুরু
এইচএম দুলাল, মংলা সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২২:৩২
অবশেষে দীর্ঘ প্রত্যাশিত মংলা বন্দরের পশুর নদী খননের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে এ খনন কাজের কার্যাদেশ প্রদান করেছে। ১০৬ কোটি ৫০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৫ লাখ ঘনফুট পলি অপসারণের গত সপ্তাহে কার্যাদেশ পেয়েছে মেসার্স চায়না হারবার এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। এদিকে পশুর নদীর খননের কার্যাদেশ দেয়ায় আগামী মাসের শেষ দিক থেকে নদীর বুক চিরে উত্তোলিত পলি ফেলা হবে ইপিজেড ও খাস জমিতে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খনন কাজ সম্পন্ন হলে আগামী বছরের দিকে বন্দর জেটিতে সহজেই দেশি-বিদেশি জাহাজ ভিড়তে পারবে। পশুর নদী ও মংলা ক্যানেলের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলা অবস্থিত। এর কার্য পরিধি হচ্ছে মংলাস্থ স্থায়ী বন্দর, পুরাতন বন্দর, সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট ও খুলনাস্থ রুজভল্ট জেটি পর্যন্ত।
বন্দরের হারবার ও কনভারভেন্সি সূত্র মতে, পশুর নদীর নাব্যতা না থাকায় ৯ মিটার গভীরতার জাহাজগুলো দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মংলা বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারছে না। বন্দরের পশুর চ্যানেলে গত ১৮ বছরের মধ্যে ড্রেজিং হয়নি। বন্দরের প্রাণ ফিরে পেতে কেবিনেট কমিটি গর্ভমেন্ট পারচেস কমিটিতে অনুমোদিত ১০৬ কোটি টাকার ড্রেজিং প্রকল্প আগামী মাস নাগাদ শুরু হবে। ৬০ সপ্তাহের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বন্দর ব্যবহারের জন্য নেপাল, ভুটান ও ভারত অপেক্ষায় রয়েছে।
বন্দরের প্রকৌশল বিভাগের সূত্র জানান, ১৯৫০ সালে বন্দরের যাত্রা শুরু হওয়ার সময় মংলা নালা ও পশুর নদীর সংযোগস্থলে নদীর গভীরতা ছিল ৩৫ ফুট। ৬৩ বছরের ব্যবধানে ২০১৩ সালে এ চ্যানেলে ৯ ফুট গভীরতার জাহাজ প্রবেশ করতে পারে না। বঙ্গোপসাগরের ফেয়ারওয়ে বয়া থেকে বন্দর জেটি পর্যন্ত ১৩১ কিলোমিটার নৌপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। দীর্ঘ এ নৌপথের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ডুবোচর ও জাহাজ ডুবে আছে। মংলা বন্দরের প্রবেশদ্বার থেকে হাড়বাড়িয়া এলাকা পর্যন্ত আসতে বিদেশি জাহাজগুলোকে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়োজিত পাইলটদের সহযোগিতা নিতে হয়। প্রতিবছর চ্যানেলে এক দশমিক ৪ ফুট পলি জমছে। আবার কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি পলি জমে। ১৯৯১-৯২ অর্থ বছরে পশুর চ্যানেলে নাব্যতা সৃষ্টির জন্য ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে মেসার্স চায়না হারবাল কোম্পানি ৩৫ লাখ ঘনমিটার পলি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারণ করে। ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে জরুরি ভিত্তিতে এক লাখ ঘন মিটার পলি অপসারণ করা হয়। অস্বাভাবিকভাবে পলি জমে বন্দরের চ্যানেলে ক্রমাগত হুমকির সম্মুখীন হলেও অর্থ সংকট এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান না পাওয়ায় বিভিন্ন সময় ড্রেজিং করা যায়নি। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটি একনেকের সভায় পশুর চ্যানেল ড্রেজিং করার জন্য একশ’ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় চ্যানেলের জয়মনির গোল থেকে বন্দর জেটির উত্তরপাশ সবুর বেকন পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার ড্রেজিং করা হবে। প্রকল্পের জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয়। একই বছরের ১৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় এবং ১৩ জুলাই টেন্ডারে তৃতীয় দফার দরপত্রে মেসার্স মালেশিয়ান মেরিটাইমস লি:, মেসার্স সিনো হাইড্রো এবং চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং দরপত্র দাখিল করে। অভিজ্ঞতা ও শর্তপূরণ হওয়ায় চায়না হারবার কোম্পানিকে ড্রেজিং কাজ দেয়া হয়েছে।
মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) মো. কাওসার আলী জানান, গত ২৩ জুন কেবিনেট কমিটির গভর্নমেন্ট পারচেস কমিটি পশুর নদীর ড্রেজিং প্রকল্প অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের আওতায় ৩৫ লাখ ১১ কিউবেক মিটার পলি অপসারণ করা হবে। গত ১০ জুলাই কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। সংশ্লি¬ষ্ট ঠিকাদার কোম্পানি ২৮ দিনের মধ্যে চুক্তি ও ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জামানত হিসেবে জমা দেবে। তিনি আরো জানান, ৬টি পয়েন্টে অর্থাত্ সবুর বেকন, জেটি ফ্রন্ট, জেটি চ্যানেল, কনফুলেন্স পয়েন্ট, মুরিং বয়া এরিয়া এবং বেসক্রিক থেকে অ্যাংকারেজ পয়েন্টে খনন কাজ চলবে। বন্দরের ট্রাফিক পরিচালক মাহবুল্লাহ জানান, উত্তোলিত পলি ইপিজেডের পাশে ২০৫ একর জমিতে এবং সংশ্লি¬ষ্ট পয়েন্টগুলোর পাশে খাস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ফেলা হবে। খনন প্রক্রিয়া শেষে বন্দর জেটিতে সাড়ে ৭ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারবে। তিনি আরো বলেন, এতে বন্দরে জাহাজ আগমনের পরিমাণ বাড়বে। প্রতিটি ভিনদেশি জাহাজ বন্দরে আগমন করলে কর্তৃপক্ষের গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার রাজস্ব আয় হবে। উল্লে¬খ্য, সর্বশেষ ২০০৪ সালে বেসিক নামক মালয়েশিয়ান কোম্পানি ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পশুর নদীতে ড্রেজিং করে। বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষ ৬২ কোটি টাকা দিয়ে একটি নিজস্ব ড্রেজার ক্রয় করেছে, যা দিয়ে জেটি এলাকায় সামান্য পরিমাণ খনন কাজ চলছে। এছাড়া আরো ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বন্দরের আরো একটি নিজস্ব ড্রেজার কেনার প্রক্রিয়া চলছে।