কয়রায় আইলা বিধ্বস্ত ১৫ হাজার মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরেনি
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২২:৩৪
আইলার পর দীর্ঘ চার বছর অতিক্রান্ত হলেও সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের ১৫ হাজার মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। বর্তমানে এই ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের জীবন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে।
সমপ্রতি সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় আইলা ও জলোচ্ছ্বাসে কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ সুন্দরবন সংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীর পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবে) বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছেন। দীর্ঘ চার বছরেও আশ্রয়হীন এসব মানুষ এখনো তাদের বাড়ি-ঘরে ফিরে যেতে পারেনি। ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও জলোচ্ছ্বাসে উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের মানুষের বাড়ি-ঘর ভেসে যায়। ভেসে যায় হাজার হাজার একর জমির ফসল, মত্স্য ঘের, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। ভেঙ্গে পড়ে ফলদ ও বনজসহ অসংখ্য গাছ-পালা। এছাড়া প্রাণহানি ঘটে বেশ কয়েকজনের। বাড়ি-ঘর হারানো আশ্রয়হীন এসব মানুষ আশ্রয় নেয় শাকবাড়িয়া বেড়িবাঁধের ওপর। এখন পর্যন্ত এসব মানুষ সরকারের কাছ থেকে বড় ধরনের কোন সাহায্য পায়নি। বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও) যে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে তাও অতি সামান্য।
উত্তর বেদকাশি গ্রামের বৃদ্ধ মকবুল শেখ বলেন, ‘চাইর বত্ছর হইয়ে গ্যালো, এহনো আমাগের দুঃখ গেইল না, কষ্টও গেইল না। এ্যাতো দিন ধইরা বাঁধের উপর ঝুপড়ি ঘর বাইন্দা আছি, কিন্তু সরকারের কাইছ থেইকা ভালো কইরা সাহায্যই পাইলাম না।’ বৃদ্ধ মকবুল শেখের মত প্রায় একই ধরনের কথা বলেন তার স্ত্রী জরিনা বেগম (৬০)। একই ইউনিয়নের কাঠমাছচর গ্রামের আব্দুল গণি ঢালি (৬০), বেদকাশি গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস (৫০), উত্তর বেদকাশি গ্রামের মুজিবর রহমান (৪০), বড়বাড়ি গ্রামের নূর ইসলাম (৬০) ও খোদেজা বেগম (৯০) বলেন, আমরা বাঁধের উপর থাকলিও জোয়ার আসলি বাঁধ উপচে শাকবাইড়ে (শাকবাড়িয়া) নদীর পানিতে বাড়ি তলিয়ে যায়। যে কোন সময় জোয়ারের পানিতে এই বাঁধটিও ভাইঙ্গে যেইতে পারে।’
কাঠকাটা গ্রামের আদিবাসী বীরেন মুন্ডা আইলার কথা স্মরণ করে বলেন, ‘চোহির পলকে বাদ-টাদ সব ভাইঙ্গে গে (নিয়ে গেছে)। চাইর বোছর আগে জমিতি পানি ঢুইকে (ঢুকেছে)। আর নাইমতেছ না। ঘর-বাড়ি বানাতি পারিনি। বাঁধে ঝুপড়ি তুইলে থাকতিচি’। শাকবাড়িয়া নদীর যে দিকটায় সুন্দরবন, ঠিক তার উত্তরে কাটকাটা গ্রামের দিকে হাত তুলে এক সময় ঘর-বাড়ির থাকার চিহ্ন দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো জাগায় কাজ-কম্ম নেই, তাই ভিটেবাড়ি ছাইড়ে অনিকে চলি গিছ (গেছে)।’
বীরেনের পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধা মায়া রানী হাঁটতে হাঁটতে বলেন, ‘আমার গুষ্টির সবাই ইন্ডিয়ায় চলি গিছ। জমিতে লবণ। ধান হতেছে না। তাই মানুষ বাঁচতি গিরাম ছাইড়েছে।’
জানা গেছে, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে গত চার বছর ধরে জমিতে ফসল ফলাতে পারছে না কয়রা উপজেলার কয়রা, উত্তর বেদকাশি, দক্ষিণ বেদকাশি, মহারাজপুর ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ। অনেকে জীবন ধারণের জন্য কয়রা ছেড়ে জেলা শহর খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রাম এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। তারা জানান, সহায়-সম্বলহীন এই সব মানুষ আর কয়রায় ফিরতে চায় না। তবে এখনো যারা মাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন তারা সুন্দরবন সংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীতে চিংড়ির রেণু-পোনা আহরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পুরুষরা সুন্দরবন থেকে কাঠ সংগ্রহ এবং নারী ও শিশুরা নদী থেকে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু-পোনা ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। উত্তর বেদকাশি গ্রামের গৃহবধূ সাবিনা বেগম (২৫) জানান, প্রতিদিন তিনি ও তার স্বামী শাহবাজ ঢালী (৩৫) শাকবাড়িয়া নদী থেকে ১৫০ থেকে ২০০টি বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করেন। এই রেণু বিক্রি করে যে এক-দেড়শ’ টাকা আয় হয় তা দিয়েই চলে তাদের চারজনের সংসার। এছাড়া শাহবাজ ও তার মত আরো অনেকে মাঝে-মধ্যে সুন্দরবনে গিয়ে কাঠ কেটে এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে তাদের সংসার চালান। আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা জানান, অভাব-অনটনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে সারাবছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষের পেটেরপীড়া ও চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ-বালাই লেগেই আছে।
স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম হাসান বলেন, ঘূর্ণিঝড় আইলা ও জলোচ্ছ্বাসে কয়রা উপজেলায় ৪১ জন মানুষের প্রাণহাণি ঘটেছে। জলোচ্ছ্বাসে ৮৪ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙ্গে যায়। বিরাট এলাকায় লবণ পানি ঢোকার পর আর বের হতে পারেনি। এতে ১৫ হাজার কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লবণাক্ততার কারণে জমি এখনও উর্বরতা ফিরে পায়নি। তবে কয়রা উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম কৃষি জমি এখন আমন চাষ উপযোগী হয়েছে বলে মনে করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের প্রধান প্রফেসর ড. দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আইলার মত ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে। আইলার কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে কয়রা উপজেলার অধিকাংশ জমি লবণ-পানিতে প্লাবিত হয়েছে। যা আর নামছে না। ফলে ফসল ফলাতে না পেরে এখানকার অনেক মানুষ এলাকা ছাড়ছে।’ অপরদিকে আইলায় বাড়ি-ঘর হারিয়ে শহরে আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষকে পরিবেশ উদ্বাস্তু হিসেবে মনে করেন পরিবেশবিদ ড. হোসেন শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ‘উষ্ণনায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের আরও ধকল সামলাতে হবে উপকূলবাসীকে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই কারণে ভবিষ্যতে পরিবেশ উদ্বাস্তুর সংখ্যা আরও বাড়বে।