‘ধরেন আপনি আমার বাবা’
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৬
তোর নাম কী?
আমার নাম রুবেল, বন্ধুরা ডাকে পেপসি রুবেল।
পকেট মেরেছিস কতবার।
কম করে হলেও হাজার বার।
বয়স কত?
চব্বিশ-পঁচিশ হবে হয়তো।
বাড়ি কোথায়?
জানি না স্যার।
তোর বাপের নাম কী?
বাবা নেই। বাবাকে দেখিনি, তাই নাম জানি না স্যার।
আমার সঙ্গে মস্করা করছিস?
না স্যার। আমি সত্যি বলছি। আপনার সঙ্গে মস্করা করলে তো পিটুনি একটু বেশি খেতে হবে। ধরে নেন আপনি আমার বাবা।
তা বুঝলাম, কিন্তু ঠিকানা কী লিখবো।
লিখে দেন কিছু একটা।
—এ কথাগুলো কোন নাটকের সংলাপ নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) কমলাপুর থানার ওসি আব্দুল মজিদের সঙ্গে কুখ্যাত পকেটমার রুবেলের কথপোকথন। একই ধরনের তথ্য দিয়েছে রুবেলের সহযোগী পকেটমার সানিরও। রমজান ও আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে রেল পুলিশ শুরু করেছে বিশেষ অভিযান। গত কয়েকদিনে রেল পুলিশের হাতে পকেটমার, চুরি, মাদকবহনসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার করেছে শতাধিক ব্যক্তিকে। যাদের অধিকাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ এর মধ্যে। পকেটমার সর্দার বলে পরিচিত রুবেল ও সানিসহ ১২ জনকে শনিবার বিভিন্ন ট্রেন থেকে গ্রেফতার করে রেল পুলিশ। তাদের ২ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল জানায়, তার জন্ম, বেড়ে ওটা সবই রেল স্টেশনকে ঘিরে। ট্রেনই তাদের বাড়ি, ট্রেনই তাদের সব। এক সময় ফেরি করেছে। শেষটায় যাত্রীদের পকেট মারাটাকেই বেছে নিয়েছে পেশা হিসেবে। ট্রেন যাত্রীদের পকেট মারে। পকেট মারতে গিয়ে বহুবার ধরা পড়ে গণপিটুনিও খেয়েছে। পুলিশও ধরেছে বেশ কয়েকবার। কিছুদিন জেলবাস। মুক্তি পাওয়ার পর আবারো শুরু করে একই কাজ। এভাবেই চলছে তাদের জীবনধারা। পকেট মেরে যে টাকা পায় তা দিয়ে আনন্দ-ফুর্তি আর খাওয়া-দাওয়া চলে।
রুবেল আরো বলে, ট্রেন ছাড়া তো আমাদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই। আর বেঁচে থাকার জন্য তো টাকার দরকার। কে দেবে এ টাকা? ফলে যাত্রীর পকেট কেটে টাকার প্রয়োজন মেটানো। পুলিশের খাতায় রুবেলের ঠিকানা দেখানো হয়েছে কোতোয়ালী, ময়মনসিংহ। গ্রাম কেওয়াঘাটখালী।
অপর দিকে সানির গ্রামের বাড়ি বগুড়ার ঠনঠনিয়ায়। জিজ্ঞাসাবাদে সানি জানায়, তার বয়স ১৮ থেকে ২০-এর মধ্যে হবে হয়ত। সেও অনেক যাত্রীর পকেট কেটেছে। গ্রেফতার হয়েছে বেশ কয়েকবার। সর্বশেষ শনিবার পকেট মারতে গিয়ে হাতে নাতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।
জিআরপি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মজিদ বলেন, তিনি যোগদানের পরপরই পকেটমার ও ছিনতাইকারী গ্রেফতারে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। আর রমজান শুরুতে এ অভিযান আরো জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি তার অভিজ্ঞতার আলোকে দেখেছেন, মার্কেট, বিপণি বিতান, বাস বা লঞ্চ টার্মিনালে যারা পকেট মারে তাদের সঙ্গে ট্রেনে পকেটমারের মধ্যে কোন ধরনের মিল নেই। ট্রেনে পকেটমারের সীমানা ট্রেনের মধ্যেই। এরা অন্য কোন স্থানে যায় না। তিনি এ যাবত্ যত পকেটমার ধরেছেন, তাদের অধিকাংশই ভাসমান। ঠিকানা, বাবার নাম, পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে জবাব একটাই তারা, কিছুই জানে না। তাদের এটা কৌশল কীনা তাও বোঝার উপায় নেই। তাছাড়া গ্রেফতার হওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে তাদের খোঁজে কোন স্বজন তদবির করতে থানায় আসে না।
তিনি আরো বলেন, কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন ৯২টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন এলাকায় আসা-যাওয়া করে। এসব ট্রেনে কম করে হলেও বিভিন্ন গ্রুপে দুই শতাধিক পকেটমার ঘুরঘুর করে। অভিযানের কারণে কমলাপুর স্টেশন এলাকায় এখন পকেটমারের দৌরাত্ম্য অনেকটা কমেছে। তবে যারা এখানে পকেট মারতো তারা অন্য স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে বলে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ট্রেনে বিশেষ করে পকেটমার ও যাত্রীদের মালামাল চুরি সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সিংহভাগেরই কোন সঠিক ঠিকানা পাওয়া যায় না। এ জন্য এদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে পুলিশকে পড়তে হয় বিব্রতকর অবস্থায়।