আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে উত্তপ্ত সংসদ

সদ্য সমাপ্ত পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত মেয়রদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্য এবং বাজেট পাসের সময় স্পিকারের গিলোটিন নিয়ে গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। এ সময় দু’পক্ষই পাল্টাপাল্টি বাহাসে লিপ্ত হয়ে একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। নির্বাচিত মেয়রদের ‘দুর্নীতিবাজ’ বলে প্রধানমন্ত্রী দেশের ১৬ কোটি জনগণকে অপমানিত করেছেন বলে অভিযোগ করেন বিএনপির ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। জবাবে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, একজন ব্যবহারজীবী (মওদুদ আহমেদ) প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন। তাদের দুর্নীতির কথা শুধু দেশেই নয়, সারা বিশ্ববাসীই জানেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। অনির্ধারিত এ বিতর্কে আরো অংশ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ও চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ। সরকার ও বিরোধী দলের আরও বেশ ক’জন সিনিয়র সদস্য বিতর্কে অংশ নিতে চাইলে সময় স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে আর কাউকে ফ্লোর দেননি স্পিকার। বিতর্কের সূত্রপাত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে বিজয়ী মেয়রদের ‘দুর্নীতিবাজ, অসত্ ও সন্ত্রাসী’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, অবিলম্বে এমন বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে। নইলে দেশের জনগণ আগামী নির্বাচনে তার সমুচিত জবাব দেবে। তিনি বলেন, ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দীনরা বিরাজনীতিকরণের উদ্দেশ্যে নিয়েই রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে দেশের ১৬ কোটি জনগণকে অপমানিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হবেন, তারা কী দুর্নীতিবাজ হিসেবে নির্বাচিত হবেন? সিটি নির্বাচনে বর্তমান সরকারকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। বর্তমান সরকার যে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তা প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রমাণ হয়েছে। যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, তাদেরকে দুর্নীতিবাজ বা সন্ত্রাসী বলা অন্যায়, সংবিধানের লংঘন। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। জবাবে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মওদুদ আহমকে লক্ষ্য করে বলেন, আজ অবাক হলাম সংসদে একজন ব্যবহারজীবী উচ্চকণ্ঠে বললেন, অতীত নিয়ে কথা বলবেন না! তাকে প্রশ্ন করি অতীত ছাড়া কী বর্তমান হয়? বর্তমান ছাড়া কী ভবিষ্যত্ হয়? যে প্রশ্নটি উত্থাপন হয়েছে তা সত্য-মিথ্যা নয়, যৌক্তিক-অযৌক্তিক নয়, যন্ত্রণা-আনন্দের বিষয় নয়। একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন রঙে-ঢঙে ভাষায় তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য জনগণকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। তারা ভুলে যাচ্ছেন বিভ্রান্তির অন্ধকার আলোর ঝলকানিতে মুছে যায়। সত্যের বিজয় হয়। বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, গত ৩০ জুন বাজেটের ওপর ৫৬টি মঞ্জুরি ও ছাঁটাই প্রস্তাব ছিল। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী সাতটি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার বিষয়টি নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ৫টি ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে দুটি বাকি রেখেই স্পিকার গিলোটিন করেছেন। বিদ্যুত্ ও পদ্মাসেতু সম্পর্কে দাবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সুযোগ দেয়া হয়নি। স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি (স্পিকার) গিলোটিন করলেন, সেই ক্ষমতা আপনার রয়েছে। কিন্তু দুটি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সুযোগ না দেয়ায় বিরোধী দল হিসেবে আমাদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন উদাহারণ টেনে বলেন, ভারতের লোকসভায় ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর দিনের পর দিন আলোচনা হয়। তিনি বলেন, এ নিয়ে একটি পত্রিকায় সম্পাদকীয় লেখা হয়। সংসদকে অধিকতর কার্যকর করার সদিচ্ছা থেকেই বোধহয় পত্রিকাটি এমন সম্পাদকীয় লিখেছে। কিন্তু পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নিয়ে সংসদে সরকারি দলের সিনিয়র সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সমালোচনা করে অনেক কথা বলেছেন। তিনি সংসদের কাছে ওই পত্রিকার সম্পাদককে ক্ষমা চেয়ে চিঠি দিতে বলেছেন। গণমাধ্যমকে আক্রমণ করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এমন বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ ধরনের ঘটনা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করার সামিল। জবাবে সরকারি দলের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ এম কে আনোয়ারের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, বাজেট পাস হওয়ার দু’দিন আগে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা করে দুপুর একটার মধ্যে ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু স্পিকার উদার হয়ে প্রায় পৌনে তিনঘন্টা আলোচনার সুযোগ দিয়েছেন।