বিআরটিসি থেকে সংরক্ষিত মহিলা আসন উধাও
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৩, ২১:১৮
শেষ পর্যন্ত গণপরিবহনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন কি উঠেই গেলো। ঘটনাটা কি? সম্প্রতি খিলগাঁও, তালতলা থেকে মোহাম্মদপুর রুটে চালু হয়েছে বিআরটিসি বাস সার্ভিস। সেখানে নারীদের জন্য আলাদা করে ৯টি সিটের কোনরকম ব্যবস্থাই নেই। না কাজে, না কথায়। বাসের গায়ে কোথাও লেখাও নেই সংরক্ষিত আসনের বিষয়টি। চালকের পিছনে উল্টোদিকের ৪টি সিটে কিছু মেয়ে বসা। বাকিরা সবাই দাঁড়িয়ে। হেলপারকে প্রশ্ন করতেই ঐ ৪টি সিট দেখিয়ে দিল। বোঝা গেল সংরক্ষিত আসন বিষয়ে সে একেবারেই অবগত নয়। কিন্তু কেন? মেয়েরাও খুব বেশি জোরালোভাবে কিছু বলছে না। হয়তোবা বলতে পারছে না। এরই ভেতর একজন পুরুষ যাত্রী বলেই ফেললেন, ‘বিআরটিসিতে মহিলা পুরুষ নেই।’ ‘অফিস টাইমে কোন নারী-পুরুষ নাই।’ আসলে তিনি কি কিংবা তারা কি পুরুষ? নাকি অমানুষ? অসংখ্য পুরুষ যাত্রী যখন সিট ছেড়ে দেন কিংবা ভিড়ের ভেতর নিজেই ভদ্রতা করে যতটা সম্ভব জায়গা করে দেন নারী যাত্রীদের তখন ঐসব অবিবেচক মানুষগুলোকে পুরুষ বললে অন্য পুরুষদের খাটো করা হবে। তাই তারা পুরুষ নন, অমানুষ। সভ্য সমাজে এরা গুটিকয়েক অসভ্য বর্বর এবং অসুস্থ মানসিকতার মানুষ।
নারী, শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য গণপরিবহনে সংরক্ষিত ৯টি আসন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, সতর্ক-বিতর্কের কোনই শেষ নেই। কেউ বলছেন, ‘সমানাধিকারই যদি হয় তবে আবার নারীদের জন্য আলাদা করে ৯টি সিট কেন?’ কেউ বলছেন, ‘৯টি সিট এরপর ১০ নম্বর সিটটি আর মেয়েদের জন্য নয়’, কেউ কেউ আবার শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের সাথে নারীদের একত্রিত করে দেখবার বিষয়টিকে মানতে পারছেন না।’ কিন্তু কেন? সমানাধিকার মানে তো ‘আমিও পুরুষ’ নয়। সমানাধিকার মানে, ‘আমিও মানুষ’। নানান তর্ক- বিতর্কের কারণে ৯টি সংরক্ষিত আসন এই মুহূর্তে উঠিয়ে দেয়া কোনভাবেই উচিত হবে না। ৯টি আসনে বসে থাকা মেয়েদের ঘিরে চাপাচাপি করে হলেও দাঁড়িয়ে থাকা অন্য মেয়েরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়। শুধু তাই নয়, ৯টি সিটের মেয়েরা নেমে গেলে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা প্রাধান্য পায়। সংরক্ষিত আসন উঠিয়ে দেয়া হলে সামান্য এই সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হবে নারীরা।
দরজায় ঝুলন্ত অনেকগুলো পুরুষের ভিড়ে একটি মেয়ে। সেও ঝুলছে। ভাবুনতো দৃশ্যটি! কি বলছে আপনার বিবেক? এই ভিড়ের মাঝেই যদি লুকিয়ে থাকে সুযোগ সন্ধানী বিকৃত কোন পুরুষ তবে তো কথাই নেই। এর নাম কি সমতা? আদৌ কি সমতা বলে কিছু আছে? যেখানে শেকড়েই গণ্ডগোল সেখানে ডালপালায় সমতা প্রশ্নের সম্মুখীন। সবকিছুতেই বোধ, বিবেক আর বুদ্ধির অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মত। টিকে থাকার যুদ্ধে নারী-পুরুষ সবাই যোদ্ধা। কিন্তু নারী হিসেবে যুদ্ধটা যদি হয় একটু বেশি, পুরুষ সহযোদ্ধা হিসেবে বিবেকের দায়বদ্ধতা কাজ করবে কি? কি বলছে বিবেক? সংরক্ষিত আসন যদি যোদ্ধা এই মেয়েগুলোকে সামান্য হলেও স্বস্তি দেয়, আপত্তি থাকা উচিত কি?
‘কেউ খাবে কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না।’ বিষয়টা তো তাই। কেউ পারছে, কেউ পারছে না। পদব্রজ, টেম্পু, হিউম্যান হলার, ৬ নম্বর, ১৩ নম্বর, তথাকথিত টিকিট বাস নানাভাবে নানারকম ধকল সামলে কেউ পারছে গন্তব্যস্থলে যথাসময়ে পৌঁছাতে, কেউ পারছে না। যারা পারছে না তারাই যাচ্ছে পিছিয়ে, পড়ছে ঝরে। পিছিয়ে যাওয়া আর ঝরে পড়ার মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে যোগ্যতা। যোগ্যতম স্থানে না পৌঁছানোর ব্যর্থতাকে মেনে নিচ্ছে অনেকেই। এই অনেকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়! কম হোক, বেশি হোক এদের নিয়েও ভাবতে হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর অনুপাত ৩:১। বেকারত্বের ক্ষেত্রে দৃশ্যটা উল্টে যায়। ৭.৫ শতাংশ নারী বেকার আর পুরুষ বেকারত্বের হার ৪.৩ শতাংশ। কেন বেকার? যোগ্যতার অভাব? না। ঐ যে পিছিয়ে পড়া, ঝরে পড়া। একবার, দু’বার, বার বার।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার সর্বত্রই নারীর উন্নতিকল্পে কল্পনার জয়জয়কার। নারীকে শিক্ষিত করতে হবে, দক্ষ মানব সম্পদরূপে গড়ে তুলতে হবে, কারিগরি প্রশিক্ষণে, চাকরিতে, সামাজিক নিরাপত্তায়, স্বাস্থ্য পরিচর্যায় সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ২৩.১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নারী যেখানে অধিক সংখ্যায় কর্মরত আছেন সেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা, বাসস্থান, বিশ্রামাগার ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নগরের সব মিনিবাসে ছয়টি এবং বড় বাসে নয়টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। তবে নারী যাত্রী না থাকলে পুরুষ যাত্রীরা বসতে পারবেন। সংরক্ষিত আসনে নারীদের প্রাধান্য থাকলেও অন্যান্য আসনেও নারীরা বসতে পারবে। এই প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন পরিবহন সার্ভিসের লোকাল ও কাউন্টার সার্ভিসের বাসে মহিলা ও শিশু প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন লেখা হয়েছে। বিআরটিসি বাসে সংরক্ষিত আসনের বিষয়টি এইভাবে উপেক্ষিত হলে বেসরকারি অন্যান্য বাস মহিলাদের যথার্থ প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করবে কি? সংশ্লিষ্ট সকলে শুরুতেই মনোযোগ দিলে হয়তোবা আজ এ মুহূর্ত থেকেই বন্ধ হবে সংরক্ষিত আসন নিয়ে অনিয়মের চর্চা। আরও বেশি নিশ্চিত হবে নারীর এগিয়ে চলা আর সকলের সাথে বন্ধুর পথে বন্ধু হয়ে।
লেখক :সংস্কৃতি ও উন্নয়নকর্মী