রাজনীতি
জিম্মি জনগণ হয়তো মন্দের মধ্যে ভাল খোঁজে
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৩, ২১:১৮
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এ দেশের দুই বৃহত্ দলই সংসদ বর্জনে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন অথচ বেতন-ভাতা, করবিহীন গাড়ি ও অন্যান্য সমস্ত সুবিধা ঠিকই ভোগ করছেন। প্রথম র্শত হলো সুশীল সমাজ, মিডিয়া ও জনগণের মতামত এবং সমালোচনা শোনা ও মূল্যায়ন করে রাষ্ট্র-শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। দ্বিতীয় শর্ত হলো বিরোধী দলের মতামত ও সমালোচনার ন্যূনতম মূল্যায়ন করা। তৃতীয় শর্ত হলো দলের ভেতরে প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চা, নেতা বা নেতৃর একক সিদ্ধান্ত বর্জন করা। আমাদের দেশে গণতন্ত্র চর্চায় উপরোক্ত নীতিগুলো কতটুকু পালিত হয় তা পাঠকই বলতে পারবেন। ইদানীংকালের চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের ভরাডুবি ও ১৮ দলীয় জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে বিভিন্ন মহলের বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে। বিশ্লেষণে একটি সত্যই সবাই তুলে ধরেছেন যে জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দলের কর্মকাণ্ড বা আমলনামার জবাব দিয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় ইস্যুর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এবং এই ফলাফল আগামী জাতীয় নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তার করবে। কিন্তু ১৪ দলীয় জোট এখনও সুশীল সমাজের মত বা জনমতকে মানতে নারাজ। বিগত সাড়ে চার বছরে ১৪ দলীয় জোটের অনেক নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়া, দুর্নীতি, আইন-শৃংখলার অবনতি, বিরোধী দল, হেফাজতের উপর নির্যাতন ইত্যাদি এ ভরাডুবির কারণ বলে বিশ্লেষকগণ মনে করেন। ২০০৮ সালে জনগণ বিএনপি জোট সরকারের পাঁচ বছরের দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অপশাসনে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে দিন বদলের প্রত্যাশায় ১৪ দলীয় জোটকে ক্ষমতায় এনেছিল। ১৪ দলীয় জোটকে জনগণ ভোট দিয়েছিল বড় রকমের দিনবদল অর্থাত্ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আশায়, কিন্তু সাড়ে চার বছরে দিনবদল কতটুকু হয়েছে এবং সরকার কতটুকু কৃতকার্য হয়েছে চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ভরাডুবি কিছুটা ইঙ্গিত দেয়। এতদসত্ত্বেও ১৪ দলের প্রজ্ঞাবান রাজনীতিকগণ মনে করেন যে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী ফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না। অথচ তাদের দলের মন্ত্রিগণ মন্তব্য করেছেন যে এ পরাজয় অশুভ ইঙ্গিত। বিরোধী দলের উপর মামলা, নির্যাতন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শেয়ার বাজার, ডেসটিনি, হলমার্ক কেলেংকারী, রানা প্লাজা ধস, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, খুন, গুম, হেফাজতের উপর অবিচার ইত্যাদি বহুবিধ ঘটনা শুধু শহরের নয়, গ্রামের মানুষও জানে ও বুঝে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু সম্পর্কেও অবগত । বিগত তিন বছর যাবত্ জনগণ সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ, রাজপথে আন্দোলন, হরতাল-অবরোধ দেখে জনমনে যে ধারণা জন্মেছে, জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত নির্বাচিত সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হলে যে দেশে পুলিশের নাকের ডগায় ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে পেটায়, পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে, ছাত্রদল-ছাত্রলীগ টেন্ডার ছিনতাই করে ব্যবসা করে, প্রভাবশালীরা খুন, ধর্ষণ, অন্যায় করে সদর্পে ঘুরে বেড়ায়, জনগণ মানববন্ধন বা মিছিল না করলে পুলিশ অপরাধীকে গ্রেফতার করে না বা মামলা নেয় না, যে দেশে খুন, গুম, অপহরণ নিত্যকার অপরাধ ও সে সবের বিচার হয় না, যে দেশে খাদ্যে কার্বাইড, ফরমালিন ও অন্যান্য বিষ এবং ওষুধে ভেজাল মিশিয়ে ধীরগতিতে মানুষকে খুন করা হচ্ছে, বিচার নেই, যে দেশে দুর্নীতির দুষ্টচক্র জনগণের অর্থ লুটে দেশের উন্নতি থামিয়ে দিচ্ছে, গরীবকে আরও গরীব বানাচ্ছে, প্রতিকার নেই, সেখানে উন্নত দেশে অনুসৃত শুধুমাত্র নির্বাচন পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে অগ্রগতি লাভ হবে না। অনুসরণ করতে হলে উন্নত দেশের ভাল সবকিছুই অনুসরণ করা উচিত। জনগণ বলে থাকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপশাসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, হাওয়া ভবনের অপকর্ম, ইত্যাদি বহুবিধ অপকর্মে বিএনপি নিমজ্জিত ছিল বলেই ২০০৮ সালে তাদের ভরাডুবি হয়েছিল। জনমানুষ সে সব ভুলেনি। কিন্তু তাদের হাতে কোন বিকল্প নেই। তাই জনগণ এখন তুলনামূলক বিচারে যাচাই করতে পারে কারা একটু বেশি ভাল এবং সে বিচারেই হয়তো তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।
লেখক : এফসিএ ও কথাশিল্পী