উত্তরাঞ্চলের ২০ লাখ কিশোরী বাল্য বিয়ের শিকার
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৯
ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০ লাখ কিশোরী বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছে কিশোরীরা। মাঝে মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন খবর পেয়ে বাল্য বিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করলেও থেমে নেই বাল্য বিয়ের প্রবণতা। দারিদ্র্যতা, অশিক্ষা ও অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবের কারণে এ অঞ্চলে বাল্য বিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না।
জানা যায়, প্রতি বছর এ অঞ্চলে হাজার হাজার কিশোরী বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছেন। সহায়-সম্বলহীন, হতদরিদ্র ঘরের মেয়েরা বিয়ের পর যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে স্বামীর অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘরছাড়া হচ্ছে। অল্প বয়সী এই গৃহবধূদের অনেকেই পরিবারের অন্যায় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। বাল্য বিয়ের শিকার পঞ্চগড়ের লিলি, লালমনিরহাটের মজিদা, ঠাকুরগাঁওয়ের জহুরা বেগম, রংপুর সদরের আরিফা বেগম, বগুড়ার আমেনাসহ বেশকজন জানান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই অপরিণত বয়সে তাদের বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। বিয়ের পর শুধুমাত্র যৌতুকের কারণে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে পাষণ্ড স্বামী ও শ্বশুর পরিবারের লোকজন। বাল্য বিয়ের শিকার অনেকেই ৩ মাসের বেশি স্বামীর ঘর সংসার করতে পারেনি। এক পর্যায়ে সহায় সম্বলহীন পিতা-মাতার কাঁধে চড়ে জীবনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছেন এসব কিশোরী।
সমপ্রতি বাল্য বিয়ে আর যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ২৫ জন কিশোরীকে সহায়তা দেয়ার জন্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস তাদের সেফ হোম আলোকিত ভুবনে নিয়ে আসে। ভাগ্যবঞ্চিত এসব কিশোরীকে এক বছর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংস্থা থেকে দর্জির কাজ, ষ্টিচিং, এমব্রয়ডারিসহ সকল বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ওরা এখন স্বাবলম্বী হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। আরিফা, জোহরা, শিল্পীরা সকলেই ছিল নিরক্ষর। সেফ হোমে এসে এরা পত্রিকা গল্পের বই পড়তে পারে। এখন তাদের একটাই কামনা নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। পিতা-মাতার বোঝা হয়ে যেন না থাকতে হয়। স্বাবলম্বী হয়ে নিজের ও দেশের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখছে হতভাগ্য এসব কিশোরী।
পঞ্চগড়ের লিলি জানায়, মাত্র ১২ বছর বয়সে তাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এক মাস যেতেই শুরু হলো তার উপর অমানুষিক নির্যাতন। পাষণ্ড স্বামী ৩০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করেন। কিন্তু লিলির পিতা এতটাই হতদরিদ্র যে নিজেরাই দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারে না আর যৌতুক দেবে কোথা থেকে। এক পর্যায়ে স্বামী তাকে মারপিট করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। এরপর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঠ কর্মীর মাধ্যমে রংপুরে সেফ হোমে এসে এক বছর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সে জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ফাতেমা, ঝর্নাসহ অনেকেই জানান, বিয়ের পর তাদের মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। যৌতুকের অভিশাপে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে তারা পিতা-মাতার বোঝা হয়ে দিন যাপন করছে। ভাগ্যবঞ্চিত এসব কিশোরী কান্না জড়িত কণ্ঠে জানায়, কোনো পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের যেন অল্প বয়সে বিয়ে না দেন। এ অঞ্চলের ২০ লাখ বাল্য বিয়ের শিকার কিশোরীর মাঝে হাতে গোনা দু’চারজনের পাশে এনজিওরা দাঁড়ালেও বাদবাকিরা রয়েছে ভাগ্য বঞ্চিতদের তালিকায়। এদের দীর্ঘশ্বাস শোনার কেউ নেই। এদের পাশে দাঁড়াবারও কেউ নেই। অনাহার, অপুষ্টির শিকর সামাজিক মর্যাদা বঞ্চিত এই কিশোরীরা অল্প বয়সে একাধিক সন্তানের মা হচ্ছে। বৃদ্ধ হবার আগেই মারা যাচ্ছে অনেকে। আমাদের দেশে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে দেয়া আইনসম্মত নয়।
ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ৩০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে ১৫ বছর বয়সে আর ১৮ বছরের নিচে বিয়ে হয় ৩৯ শতাংশ মেয়ের। এছাড়া প্রতি ১০জন কিশোরীর মধ্যে ৩ জনকে ১৫ বছর হওয়ার আগে বিয়ে দেয়া হয়। আর প্রতি তিনজনের মধ্যে ২ জনকে বিয়ে দেয়া হয় ১৮ বছরের আগে। উত্তরাঞ্চলে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ কিশোরী। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হচ্ছে ১৫ বছর বয়সে আর ৩৯ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের নিচে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে ২০ লাখের ওপর কিশোরী বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এ ব্যাপারে আরডিআরএস’র হেড অব প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেশন মঞ্জুশ্রী সাহা বলেন, এ অঞ্চলে বাল্য বিবাহের হার অনেক বেশি। যৌতুক এখন সামাজিক ব্যাধি হিসাবে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বিয়ের রাতেই যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কিশোরীরা। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য অভিভাবকসহ জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।