রায়ে সন্তুষ্ট আওয়ামী লীগ, হতাশা প্রকাশ করেছে শরিকরা
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৩, ২৩:০০
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে গোলাম আযমের ৯০ বছর কারাদণ্ডের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দেশবাসীকে বিশৃঙ্খলা না করার আহ্বান জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল সোমবার রায় ঘোষণার পর দুপুরে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের পক্ষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এ আহবান জানান। এদিকে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি দলের নেতৃবৃন্দ ইত্তেফাককে জানান, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গোলাম আযমের যে ভূমিকা ছিল তাতে সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রত্যাশা করেছিল দেশবাসী। কিন্তু আমাদের হতাশ হতে হয়েছে। বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা আদালতের কাজ নয়। অপরাধের ওপর ভিত্তি করেই আদালতের রায় ঘোষণার কথা ছিল। বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করবেন রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়ার ভার ১৪ দল নেবে না বলেও শরিক দলের নেতৃবৃন্দ জানান।
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগই প্রমাণিত হওয়ায় গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়। তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ফাঁসি না হওয়ায় রায় প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল এবং শাহবাগ মোড় অবরোধ শেষে আজ হরতালেও ডাক দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলও এ রায়ে সন্তুষ্ট নয় উল্লেখ করে, আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে সকল যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ইত্তেফাককে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে তা ‘জনগণের প্রত্যাশা’ পূরণ না করলেও তাতে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি যুদ্ধে’ একধাপ আগ্রগতি হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত আবারো দেশের ক্ষমতায় এলে এই দণ্ডিত আসামিরা মুক্তি পেয়ে যাবে বলেও জনগণকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে তিনি বলেন, জনগণকে সজাগ থাকতে হবে। কোনো ভুল করলে তার খেসারত জনগণকেই দিতে হবে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমরা এ রায় নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করছি। যদিও গোটা জাতির প্রত্যাশা ছিল এ যুদ্ধাপরাধীর রায় মৃত্যুদণ্ড হবে। তবে শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে তাকে ৯০ বছর সাজা দেয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে একজন যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে এ রকম সাজার দেয়ার নিদর্শন পৃথিবীতে আছে কি না আমরা জানি না। এ রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ উচ্চতর আদালতে আপিল করবে কিনা জানি না। সেটা আইনজীবীরা সিদ্ধান্ত নিবেন বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করেছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে এটা মানুষ ভুলে গেছে। শেখ হাসিনা সংকল্প নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক বদিউজ্জামান ভুঁইয়া ডাবলু, কেন্দ্রীয় নেতা একেএম এনামুল হক শামীম প্রমুখ।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক গতকাল বিকালে এক যুক্ত বিবৃতিতে গোলাম আযমের রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেন, গোলাম আযম মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ করার পরও তাকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়া কোনো যুক্তিতেই গ্রহণ করা যায় না। গোলাম আযম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রধান বিরোধীতাকারী এবং পাকিস্তানিদের প্রধান সহযোগী হিসেবে রাজাকার-আলবদর-আলসামস বাহিনী গঠন করেছিলেন এবং তারই নির্দেশে দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞ চলেছিল। নেতৃবৃন্দ তার এই রায়ের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সন্তুষ্টিতেও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধাপরাধসহ মৌলবাদ-সামপ্রদায়িকতার প্রশ্নে দ্বিধা দোদুল্যমান্যতা ঐ অপশক্তিকেই এযাবত লাভবান করেছে এবং করবে। বিবৃতিতে নেতৃবন্দ এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকারকে আপিল করার জন্য আহ্বান জানান।
জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া জানান, এ রায়ে আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। জনগণও এ রায় মেনে নিতে পারবে না। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। কিন্তু আদালত যে রায় দিয়েছে তাতে অপরাধের চেয়ে তার শারীরিক অবস্থার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ধারক আওয়ামী লীগ এ রায়ে কিভাবে সন্তোষ প্রকাশ করে তা আমার বোধগম্য নয়। আর আওয়ামী লীগের ওই প্রতিক্রিয়া তাদের নিজস্ব। এর ভার ১৪ দল নেবে না। কমিউনিস্ট কেন্দ্রের যুগ্ম-আহ্বায়ক ডা. অসিত বরণ রায় বলেন, এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ রায়ে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।
গণতন্ত্রী পর্টির সাধারণ সম্পাদক নূরুর রহমান সেলিম জানান, এ রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেয়ার মানসিকতা আগেই হারিয়ে ফেলেছি। এ রায় তার অপরাধের তুলনায় নগণ্য। তিনি বলেন, আদালত যে কাজ করেছে, সেটি মূলত রাষ্ট্রপতির কাজ ছিল। বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করবে রাষ্ট্রপতি।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের যুগ্ম মহাসচিব শফিকুল বাহার মজুমদার টিপু জানান, রায়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা গোলাম আযমসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবিতে রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আজও ঐক্যবদ্ধ বলে জানান তিনি।