খোশ আমদেদ মাহে রমজান
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৩, ২৩:০০
আজ ৬ রমজান। এই মাস মূলতঃ আত্মশুদ্ধি ও প্রশিক্ষণের। গোনাহ মাফের ও জাহান্নামের আগুন থেকে নিষ্কৃিত লাভের। আল্লাহর প্রিয় হওয়ার এবং ‘রাইয়ান’ নামক দরজা পাওয়ার জন্য এর চেয়ে উত্কৃষ্ট সময় আর নেই। এ মাসের অন্যতম অবদান সাহারী খাওয়া। আরবী সাহারুন অর্থ রাতের শেষ ভাগ। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আমি তাদের (লূত নবী পরিবারবর্গকে) রাতের শেষ ভাগে মুক্তি দিয়েছিলাম (সূরা কামার ৫৪:৩৪ আয়াত, তফসীর ইবনে কাসীর ৪র্থ খণ্ড, ২৬৬ পৃঃ)। একটি হাদীসে প্রিয় নবী (স.) বলেন, আমাদের এবং আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো শেষ রাতের খাওয়া (মুসলিম ১ম খণ্ড, ৩৫০ পৃঃ তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ৮৯ পৃঃ আবূ দাউদ ১ম খণ্ড ৩২০ পৃঃ মেশকাত ১৭৫ পৃঃ)। আল্লাহর রসূল (স.) বলেন, তোমরা সাহারী খাও, কারণ সাহারীর মধ্যে বরকত রয়েছে (বুখারী ও মুসলিম)।
নবী (স.) বলেন, তোমরা দিনে শুয়ে রাতের সালাতের জন্য এবং সাহারী খেয়ে দিনে রোজা রাখার জন্যে সাহায্য গ্রহণ কর (ইবনে মাজা, ১২৩ পৃঃ, ইবনে খুযায়মা, ৩য় খণ্ড, ২১৪ পৃঃ মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২২৯ পৃঃ)। নবী (স.) আরো বলেন- তোমরা সাহারী খাও, যদিও তা এক ঢোক পানি হয় (মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২২৮ পৃঃ ইবনে আবী শায়বা ৩য় খণ্ড. ৮ম পৃঃ)। অথবা একটা খেজুর হয় কিংবা কিশমিশের দানা হয় (তাবারানী, আওনুল বারী ৪র্থ খণ্ড, ৩২১ পৃঃ)। কারণ, যারা সাহারী খায় তাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় এবং ফেরেশতারা তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করে (আহমাদ, নায়লুল আওতার ৪র্থ খণ্ড, ১০৫ পৃঃ, ইবনে হিব্বান, তালখীসুল হাবীর ১৯৩ পৃঃ)। রসূল (স.) তার সাহাবীদের বললেন, তোমরা এটাকে মোটেই ছেড়ো না (মুসনাদে আহমাদ, নাসাঈ ১ম খণ্ড, ২৩৫)।
সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন ঃ বেলালের আজান তোমাদেরকে সাহারী খেতে কখনই যেন বাধা না দেয় (মুসলিম, তিরমিয়ী, মেশকাত, ৬৬ পৃঃ)। ইবনে ওমরের (রা.) বর্ণনায় নবী (স.) বলেনঃ বেলাল রাতে (সাহারী খাবার) আজান দেয়। তাই তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত খাও এবং পান কর যতক্ষণ ইবনে উম্মে মাখতুমের (ফজরের) আজান শুনতে না পাও (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত ৬৬ পৃষ্ঠা, নাসাঈ ১ম খণ্ড, ৭৫ পৃঃ)।
উক্ত হাদীস দুইটি প্রমাণ করে যে, রমজান মাসে সাহারী খাবার উদ্দেশ্যে সাধারণ জনগণকে জাগাবার জন্য রসূলের (স.) জামানায় সাহারীর আজান দেয়া হতো। আজও পবিত্র কা’বাতে এবং মদীনার মসজিদে নববীতে বার মাসই তাহাজ্জুদ এবং সাহারীর আজান দেয়া হয়।
যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, আমরা রসূলুল্লাহর (স.) সাথে সাহারী খেতাম, তারপরে সালাতে দাঁড়াতাম। কেউ যায়েদকে জিজ্ঞেস করলেন, সাহারী ও ফজরের নামাজের মধ্যে কত সময়ের পার্থক্য থাকতো? তিনি বলেন, ৫০টি আয়াত পড়ার সময় যত (বুখারী ২৫৭ পৃঃ, মুসলিম ১ম খণ্ড ৩৫০ পৃঃ, ইবনে মাজাহ ১২৩পৃঃ)। সাধারণত ৫০টি মধ্যম শ্রেণীর আয়াত পড়তে ১৫/২০ মিনিট সময় লাগে। তাই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর রসূল (স.)ও সাহাবায়ে কেরাম ফজরের নামাজের মাত্র ১৫/২০ মিনিট আগে সাহারী খাওয়া শেষ করতেন। অতএব আমাদেরও উচিত রসূলুল্লাহর (স.) সুন্নত পালনার্থে ফজরের সালাতের ১৫/২০ মিনিট আগে সাহারী খাওয়া শেষ করা। শেষ ভাগে সাহারী খাওয়ার ব্যাপারে নবী (স.) বলেন: নবুওতের ৭০ ভাগের এক ভাগ হলো শেষ সময়ে সাহারী খাওয়া ও ইফতার নির্দিষ্ট সময়ে করা এবং ইফতারের নির্দিষ্ট সময় হলে ইচ্ছা করে বিলম্ব না করা (মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২৩২ পৃঃ)। সমস্ত নবীদেরই আদর্শ ছিল ইফতার নির্দিষ্ট সময়ে এবং সাহারী শেষ ভাগে করা (মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২৩২ পৃঃ ইবনে আবী শায়বা, ৩য় খণ্ড, ১৩ পৃঃ নাসবুর রা-য়াহ ২য় খণ্ড, ৪৭০ পৃঃ)।
এ জন্যই নবী (স.) সাহারীর খাবারকে বরকতময় প্রভাতী খাবার নামে অভিহিত করেছেন (আবূ দাউদ, নাসাঈ, মেশকাত, ১৭৬ পৃঃ ইবনে খুযাইমা ৩য় খণ্ড, ২১৪পৃঃ ইবনে আবী শায়বা, ৩য় খণ্ড ৯ পৃঃ)।
সুতরাং আল্লাহর সান্নিধ্যলাভের এই ‘শাহরুন আজীম’ বা সুমহান মাসে আমরা নির্দিষ্ট সময়ে সাহারী ও ইফতারী করতে পারি। সাথে সাথে রোজা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত হয়ে আমাদের রোজাকে কবুলযোগ্য হিসাবে দরবারে ইলাহীতে পেশ করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সে তাওফিক দান করুন, আমীন। ই-মেইল ঃ mzhazadi@yahoo.com