কে জানত সুন্দরদিদির সঙ্গে দেখা হবে আবার, দেখা হবে এতকাল পরে। একদিন আমি গিয়ে হাজির হব দু শ মাইল দূরে, ভাটিয়ারিতে।
নিরিবিলি ছোট্ট এক দেহাতি ইস্টিশান ভাটিয়ারি, গাঢ় সবুজ পাহাড়ের কোলঘেঁষা এক পাহাড়ি ইস্টিশান। লাইন থেকে মাত্তর এক শ হাত দূরে এ পাহাড়। অদূরে বঙ্গোপসাগর।
কলকল ধ্বনি শোনা যাবে। আমি গিয়ে উঠব রোদওঠা চিকচিক সকালে, রাতজাগা ঢুলঢুলু চোখে। মৃদু গুঞ্জন শুরু হবে এ দেহাতি ইস্টিশানে ট্রেন থামবার সঙ্গে সঙ্গেই। যাত্রীরা নামবে, কবরীবাঁধা উঠতি বয়েসের মেয়ে নামবে, নামবে ফ্রকপরা শহুরে ছেলেমেয়ে, ওদের মা-বাবা আর সঙ্গে থাকবে হোল্ডঅল, বাক্স-পেটরা, লটবহর, আরো কতকি। তারপর নামবে দেহাতি মেয়েছেলে ঘোমটা পরে। কুলি আসবে। বলবে, পারবেন না স্যার, পারবেন না আপনি অত ভারী জিনিস।
তুমি পারবে?
পারব না, স্যার!
আমি বলব, তবে নাও।
পাহাড় ডিঙিয়ে সূর্য উঠবে ততক্ষণে। ভাটিয়ারি ইস্টিশান চিকচিক করবে হলুদরঙা রোদে। বাচ্চা বয়েসী ক’টি ছেলে এদিক-সেদিক কেবল ছুটোছুটি করবে চা-আ গরম, চা-আ গরম বলে।
প্যাড দিয়ে চশমা মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে হাঁটব আমি। পেছন ফিরে কুলি জিগগেস করবে, কোথায় যাব, স্যার?
সত্যি তো, কোথায় যাবে, সুন্দরদিদি কোথায় থাকে কে জানে। কোথায় থাকে সুন্দরদিদি?
মনে মনে প্রশ্ন করব আমি।
আমাকে ভাবতে দেখে কুলি অবাক হবে। বিস্ময়ে জিগগেস করবে, কোথায় যাবেন, তাও জানেন না স্যার? আচ্ছা লোক তো আপনি, তবে এলেন কোত্থেকে, কী মনে করে?
ওর কাছে বোকা বোকা ঠেকব আমি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ও দেখবে আমার মাথার উসকুখুসকু চুল জুতো শার্ট চশমা। আমি কিন্তু তখনো ঠিক করতে পারব না কিছু। শুধু ভাবব। পকেট থেকে সিগারেট বার করব। ধীরে ধীরে কেসের বুকে ওটাকে বার কয়েক ঠুকব হাঁটতে হাঁটতে। একটু ভেবে তাকেই জিগগেস করে বসব, সুন্দরদিদি, মানে মিতা চৌধুরী...?
শেষ না করতেই ও আমার মুখের কথা কেড়ে নেবে। বলবে, তাই বলুন স্যার, মিতাদির বাসায় তো?
চেনো তুমি?
চিনি না, খুব চিনি। মিতাদিকে সবাই চেনে। ও বলবে আর পা চালিয়ে হাঁটবে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলবে, এ লাল কোয়ার্টারটায় থাকেন মিতাদি।
সবাই চেনে! আমি হাসব ওর কথা শুনে। মনে মনে।
আপনি কিছু হন? কুলি শুধোবে।
না তা আর কী হব। জবাব দেব আমি মৃদু হাসতে হাসতে।
তা কি আর হয় মিতাদির স্বামী হন নিশ্চয়ই?
ছি ছি বলছ কী তুমি?
ও থতমত খেয়ে যাবে। মোড় ঘুরিয়ে বলবে, ঢাকা পড়েন, না?
ওর কথার জবাব না দিয়ে পকেট থেকে সিগারেট বার করব। ও বুঝবে। বুঝে চুপ করে যাবে। মিনিট চারেকের মধ্যে এসে যাব চুপচাপ একটা স্টাফ কোয়ার্টারের কাছে। জানলার কাছ ঘেঁষে দুটো কদমগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকবে। উদাস উদাস হাওয়া বইছে। স্নিগ্ধ সবুজ গন্ধ ছড়াবে। (অংশ)
লেখকের ‘অলৌকিক এক পাখি’ (সুবর্ণ, ১৯৮৮) গল্পগ্রন্থ থেকে