দারিদ্র্যসীমার নিচে যাহাদের বসবাস
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৩, ২১:২৮
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় বলা হইয়াছে যে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এমডিজির ৩৪টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ২০টি অর্জিত হইয়াছে অথবা হওয়ার পথে। দারিদ্র্য ব্যবধানও হ্রাস পাইয়াছে আনুপাতিক হারে। তবে এখনো পাঁচ কোটি মানুষের বসবাস দারিদ্র্যসীমার নিচে। অর্থাত্ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। দারিদ্র্য বিমোচনের বিভিন্ন সূচকে প্রশংসনীয় সাফল্যের জন্য মাত্র কিছুদিন আগেই যেইখানে বাংলাদেশ জাতিসংঘের একাধিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা লাভ করিয়াছে, সর্বোপরি বাংলাদেশের এই সাফল্য যেইখানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিকটও বিস্ময়কর বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছে, সেইখানে পাঁচ কোটি মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসের খবরে অনেকে যুগপত্ বিস্মিত ও বিচলিত বোধ করিতে পারেন বৈকি। তবে মাত্র দুই দশকে কী দুঃসহ দারিদ্র্যের দুর্গমগিরি আমরা অতিক্রম করিয়া আসিয়াছি, সেই পরিসংখ্যানের দিকে তাকাইলে সকল বিস্ময় ও অন্তর্যাতনা প্রশমিত হইতেও সময় লাগিবে বলিয়া মনে হয় না।
প্রসঙ্গত লক্ষণীয় যে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯২ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে ইহা ছিল ৫০ দশমিক ১ শতাংশ, ২০০০ সালে ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০১০ সালে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাত্ গত ১৮ বত্সরে দারিদ্র্য কমিয়াছে ২৫ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যেইখানে জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ বাস করিত দারিদ্র্যসীমার নিচে, ২০১০ সালে তাহা নামিয়া আসিয়াছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। শুধু তাহাই নহে, মাত্র চার দশক আগেও বাংলাদেশ বলিতে অনাহারী-অর্ধাহারী মানুষের যেই ছবিটি চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিত, এখন দেশের কোথাও তাহা খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। আমাদের সামগ্রিক বাস্তবতার নিরিখে এই অর্জনকে খাটো করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই।
কী সেই বাস্তবতা—এই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ইহার উত্তরটিও দেশবাসীর অজানা নহে। এই বাস্তবতার বৃহদংশই জুড়িয়া আছে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতা। আছে গ্যাস-বিদ্যুত্ ও অবকাঠামোগত দীর্ঘস্থায়ী সব সমস্যার অচলায়তন। পদে পদে অনিয়ম, অব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার মতো নানা প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। সেই সাথে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদী ভাঙনের মতো সাংবাত্সরিক প্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ-বিপর্যয়ের বিষয়টিও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। সর্বোপরি, আমাদের সম্পদ সীমিত। জনসংখ্যা অত্যধিক। অতএব, ইহা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশের যাহাকিছু অর্জন তাহা সম্ভব হইয়াছে এই প্রতিকূলতার পাহাড় ঠেলিয়াই। আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষই যে এই অর্জনের আসল নায়ক—তাহা লইয়াও খুব একটা দ্বিমত নাই। কৃষি, প্রবাসীদের আয় ও পোশাক শিল্প হইতে শুরু করিয়া অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সকল সূচকেই তাহা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত। সর্বোপরি, দেশব্যাপী ছড়াইয়া থাকা শত-সহস্র ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার অসামান্য অবদান তো আছেই। বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে অভিহিত করিয়া বিশ্বব্যাপী যেইসব প্রশংসা ও আশার বাণী উচ্চারিত হইতেছে তাহার মূলেও রহিয়াছে সাধারণ মানুষের এই অদম্য উদ্যম ও প্রাণশক্তি।
একদিকে অফুরন্ত সম্ভাবনার সোনালি হাতছানি, অন্যদিকে অন্তহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল শাসন, দুর্নীতি এবং অবকাঠামোগত নানা সমস্যা লইয়া বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা অনস্বীকার্য যে, কার্যকরভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করিতে হইলে সম্পদ বৃদ্ধি করিতে হইবে। উন্নয়ন ঘটাইতে হইবে জীবনমানের। আশার কথা হইল, জনগণ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তৈরি হইয়া আছে। দারিদ্র্যকে যে পরাস্ত করা সম্ভব—ইতিমধ্যে তাহাও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করিয়া দিয়াছে। জনগণের অন্তর্নিহিত এই শক্তি ও সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে দারিদ্র্য যে সত্যি সত্যিই অতীতের বিষয় হইয়া দাঁড়াইবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তবে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিতে কতোটা প্রস্তুত সেই প্রশ্ন থাকিয়াই যায়।