৫-০ তে কি সব শেষ
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৩, ২১:২৯
‘ধবল ধোলাই’ বা ‘হোয়াইট ওয়াশ’ বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম এবং তাদের ভক্তদের কাছে খুব পরিচিত শব্দ। দ্বি-পাক্ষিক কোনো সিরিজে একটি দল অন্য একটি দলের কাছে সবগুলো ম্যাচ হেরে গেলে তাচ্ছিল্য করে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বহুবার বাংলাদেশ টিম এই লজ্জাজনক শব্দের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে আমি ও আমরা এ লজ্জার অংশীদার হয়েছি। কিন্তু পরক্ষণেই নতুন সিরিজের জন্য আশায় বুক বেঁধেছি। আমাদের আশা, ধৈর্য এবং খেলোয়াড়দের একাগ্রতায় আজ বাংলাদেশ সমীহ করার মতো দল। গত এশিয়া কাপ তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।
সামপ্রতিক সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কাছে ধবল ধোলাইয়ের শিকার হয়েছে। পাঁচপাঁচটি নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন নেতা-কর্মীরা যে বিমর্ষ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এ পরাজয়ের মধ্যেও কিছু অন্তর্নিহিত জয় আছে যা দিয়ে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়া যায়।
সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় নির্বাচন হলেও এবার সেটা জাতীয় নির্বাচনের ড্রেস রিহার্সেলের মতো করে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় নেতাদের দৌড়ঝাঁপ, সিনিয়র নেতাদের নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান, ধর্ম ও টাকার অবাধ ব্যবহার, মিডিয়ার বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহ সব মিলিয়ে সিটি নির্বাচন এবার বলিউডের সুপারহিট সিনেমাকেও হার মানিয়েছে। এতে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা তা নির্বাচন কমিশন বলতে পারবেন, আমি সে তর্কে যাচ্ছি না।
এখন প্রশ্ন হলো—এই হারে ক্ষমতাসীনরা কি সবই হারিয়েছে? আমার সোজাসাপটা উত্তর হলো, না। কারণ ক্ষমতাসীনরা বিরোধী শিবিরকে এই মেসেজটা দিতে পেরেছেন যে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচনে জেতা যায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখন এই সরকারের ওপর কমবেশি নির্ভরতা আনতে পারবেন। এছাড়া ১৮ দলের তৃণমূল নেতারা নির্বাচনে জয়ের যে মজাটা পেয়ে বসেছেন সেটার কারণেই তাঁরা তাঁদের হাইকমান্ডকে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য চাপ দেবেন। খালেদা জিয়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়ের পর তাঁর নেতা-কর্মীদের জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। অতএব, আমার ধারণা বিএনপি, দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনে যাবে। কেননা ৫-০ তে জয়ের এই আত্মবিশ্বাস বিএনপি উপেক্ষা করতে পারবে না। আর সিটি কর্পোরেশন জয়ের টাটকা স্বাদ নেতা-কর্মীদের মুখে অনেক দিন লেগে থাকবে।
ফলে তত্ত্বাবধায়কের যে কাঁটাটি এতদিন অস্বস্তি দিচ্ছিল, সেটি সিটি কর্পোরেশনগুলোতে বিএনপির জয়ে অনেকাংশে দুর্বল হয়ে যাবে। আর এটিই হলো ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে বড় জয়। আর এই ভিত্তি নিয়ে ক্ষমতাসীনরা তাদের ভুলগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সামনে এগিয়ে গেলে জাতীয় নির্বাচন যে এতোটা একচেটিয়া হবে না সেটা আমি হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু এর আগে আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজাতে হবে, তৃণমূল থেকে হাইকমান্ড পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের যে সব অর্জন— যেমন ধারাবাহিক প্রায় ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষিতে বাম্পার ফলন, বিদেশি বিনিয়োগ ও শিক্ষায় বিপ্লব, এমডিজি অর্জন, নারীর ক্ষমতায়ন এই বিষয়গুলোকে মানুষের কাছে প্রচার করে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে ফিরলে, জনগণ খালি হাতে ফেরাবে না।
বিএনপি ও তার জোট এই মুহূর্তে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট করে, হেফাজতের সামপ্রদায়িকতায় সুড়সুড়ি দিয়ে অথবা আল্লামা শফী সাহেবের তেঁতুল তত্ত্বে সম্পৃক্ত হয়ে কতদিন জনপ্রিয় থাকা যাবে তা সময় বলে দেবে। কেননা সমগ্র বাংলাদেশ ’৭১ কে হূদয়ে ধারণ করে,পলাশ ফুলের রক্তিম আভায় এখানে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত খেলা করে, কোনো ঘন বর্ষায় কান পাতলে আজও বীরাঙ্গনার কান্নার শব্দ শোনা যায়। আমার ভয় শুধু একটা— বিএনপি আওয়ামী লীগকে হারাতে গিয়ে না আবার বাংলাদেশকেই হারিয়ে ফেলে।
ঢাকা