জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৩, ২২:৫২
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা ৪২ বছর পরে সাহস নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু করেছি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক চাপের মুখে, জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ট্র্যাইবুনালে যারা কাজ করছেন, তারা প্রত্যেকে বিচারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। একের পর এক রায় দিয়ে যাচ্ছেন। এটাই হচ্ছে জাতির সব থেকে বড় পাওনা। গোলাম আযমের রায়ে ঘোষণার কথা শুনে জামায়াত-শিবির হরতাল ডেকেছে। আর হরতালের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিএনপি দু’দিন সংসদে আসেনি। এতে করে গোলাম আযম আর যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি বিএনপি নেত্রীর সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে গিয়ে বিএনপি নেত্রী কী না করেছেন। হিন্দু বাড়ি ও মন্দিরে আগুন দিয়েছেন। বৌদ্ধ মন্দির লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছেন। কানসাটে বিদ্যুত্ কেন্দ্র জ্বালিয়ে দিয়েছেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতরে আগুন দিয়েছেন।
চলতি বাজেট অধিবেশনের সমাপনি দিনে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখার সময় তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত গোলাম আযমের বিচারের রায় হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগের সবই প্রমাণ হওয়ায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে ট্রাইব্যুনাল জামায়াত-শিবিরকে স্বাধীনতা বিরোধী দেশদ্রোহী হিসাবে দোষী সাব্যস্ত করেছে। গোলাম আযমকে আন্তর্জাতিক ট্র্যাইবুনাল যে শাস্তি দিয়েছ তাতে আমরা সন্তুষ্ট।
সংসদ নেতা বলেন, বিচারে কার কি ধরনের সাজা হবে না হবে সেটা আদালতের বিষয়। আদালতের বিষয় নিয়ে কোন মতামত দিতে চাই না। কিন্তু আমি এ কথা বলবো, যুদ্ধাপরাধী হিসাবে গোলাম আযম যে সাজা পেয়েছে এটাই আমাদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা আর সংগ্রামের ফসল আজ বাস্তবায়ন হয়েছে। আমরা ক্ষমতায় থাকতেই রায় কার্যকর করা শুরু করতে পারব।
তিনি বলেন, রায় নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছেন। সংসদেও কেউ কেউ আওয়ামী লীগকে দোষী করতে চাচ্ছেন। আমার জিজ্ঞাসা, যে জেনারেল জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনেছিলো; সেই জিয়ার সাথে তো অনেকেই হাত মিলিয়েছিলেন। জিয়ার সাথে তো অনেকের ভালো সখ্য ও দহরম-মহরম ছিলো। তখন বিএনপিকে সমর্থন দিতে অনেকেই পিছপা হননি। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সংবাদপত্রের পাতায় দৃষ্টি রাখলে দেখা যাবে জিয়ার সাথে কার কী ধরনের সম্পর্ক ছিলো। জিয়াউর রহমান যখন যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনেন তখন সকলে যদি তীব্র প্রতিবাদ করে জিয়াকে প্রত্যাখ্যান করত তাহলে এই বিচারে ৪২ বছর সময় লাগত না।
প্রসঙ্গ বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড
তিনি বলেন, বিশ্বিজিত্ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা সবাই ছাত্রলীগের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছিল। তাদেরকে সদস্য করা হয়নি। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর সকলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছি এবং বিচার শুরু হয়েছে। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ভাই আত্মীয়-স্বজন অনেকে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতের সাথে জড়িত। অথচ এরা রাতারাতি ছাত্রলীগ হয়ে গেছে। এরা মনে করে সরকারি দলে যোগ দিলে মনে হয় তাদের সকল অপকর্ম ঢাকা পড়ে যাবে। কিন্তু আমরা সেটা হতে দেইনি। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে যারা ছাত্রলীগের ছিলো তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। দেশে কতগুলো লোক বা গ্রুপ থাকে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা সেই দলের হয়ে যায়। এরা হচ্ছে পার্মানেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি।
তিনি তেঁতুল হতে চান?
হেফাজত নেতা আহমদ শফির বক্তব্যকে জঘন্য হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন নোংরা কথা বলার পরেও কিভাবে বিএনপি নেত্রী তার বক্তব্যে সমর্থন জানান? ‘তিনি নেত্রী যদি মাওলানা শফীর তেঁতুল হতে চান তাহলে আমাদের কিছু বলার নেই।’
সব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে সকল নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি নির্বাচন হয়েছে। কেউ একটি অভিযোগ তুলতে পারেনি। কারণ গণতন্ত্রকে আমরা সম্মান করি। রাষ্ট্রপতি সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে সার্চ কমিটি গঠন করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। এই কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তাদের আর্থিক স্ব্বাধীনতাও দেওয়া হয়েছে। এতটা স্ব্বাধীনতা এর আগে কোন নির্বাচন কমিশন ভোগ করেনি।
ছাত্রলীগের ৬০০ নেতাকর্মী গ্রেফতার
তিনি বলেন, মহাজোট ক্ষমতায় এসে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের চেষ্টা করেছে। যখনই কোন অভিযোগ পাওয়া গেছে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকার কোথাও অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়নি। ছাত্রলীগের ৬০০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অতীতে কোন সরকারি দলের নিজ সংগঠনের এতবিপুল সংখ্যাক নেতা-কর্মী গ্রেফতারের নজির নেই।
বিএনপি-জামায়াতের শাসনামল
তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে বিরোধী দলের দু’জন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। হাওয়া ভবনের পাওনা বুঝিয়ে না দিলে কোন ব্যবসায়ীকে ব্যবসা করতে দেওয়া হত না। গাজীপুরে খোয়াব ভবন তৈরি করে নানা কীর্তিকলাপ করা হয়েছে। চট্টগ্রামে তাদের নিজ দলের ব্যবসায়ী জামাল উদ্দীনকে অপহরণের এক বছর পর তার কংকাল উদ্ধার করা হয়। সারাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার করেছে। ক্ষমতায় থাকার সময় আজকের বিরোধী দলীয় নেত্রীর পুত্র ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের দিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করা হয়েছে।
হেফাজতের তাণ্ডব ও হলমার্ক
তিনি বলেন, গত ৫ মে রাজধানীতে হেফাজত তাণ্ডব চালিয়ে যেভাবে কোরআন শরীফের কপিতে আগুন দিয়েছে তা দেখলে চোখে পানি এসে যায়। কোন মুসলমান এটা সহ্য করতে পারে না। হাইতির ভূমিকম্পে ছবি দেখিয়ে তারা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মাওলানাদের লাশ বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। কতবড় ধোকাবজি তারা করছে! প্রধানমন্ত্রী বলেন, চোর ধরতে গিয়ে এখন আমরাই চোর। হলমার্কের কেলেঙ্কারির নায়ক তানভীরকে হাওয়া ভবনের লোক। বিরোধী দলীয় নেত্রীর দুই পুত্রের বিরুদ্ধে এফবিআই ঢাকায় এসে সাক্ষী দিয়েছে। সিঙ্গাপুর আদালতে আরেক পুত্রের অর্থ পাচার প্রমাণ হওয়ার পরে তা ফেরত আনা হয়েছে। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় ফালু ও বাদলকে ধরলেই।