মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

মুজাহিদের রায় আজ

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার মামলার রায় আজ বুধবার ঘোষণা করা হবে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার রায় ঘোষণার এই দিন ধার্য করেন। গত ৫ জুন মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। মুজাহিদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭টি অভিযোগ রয়েছে। আজকের রায় হবে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন এবং বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক শাহিনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চতুর্থ রায়। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত রুকন পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আর জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ৯০ বছর ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে আরো পাঁচজনের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। মুজাহিদের বিরুদ্ধে মামলার রায়ে সর্বোচ্চ দণ্ড প্রত্যাশা করে রাষ্ট্রপক্ষ। কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ বলেন, একাত্তরে আল-বদর বাহিনীকে জল্লাদের ভূমিকায় নামিয়েছিল মুজাহিদ। তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশায় ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনা সাতটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে- এটাই প্রত্যাশা করি। বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মুজাহিদের বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তাতে তার মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো দণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তবে মুজাহিদ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তার আইনজীবী মুন্সি আহসান কবীর। তিনি বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা ১৪ মাস তদন্ত করার পর আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে বলেছেন, রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর সঙ্গে মুজাহিদের সম্পর্কের বিষয়ে তদন্তকালে কিছু পাননি। এমনকি কোনো তালিকায়ও মুজাহিদের নাম নেই। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য ও দালিলিক কোনো কিছু দিয়ে মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, মুজাহিদ আল বদর কমান্ডার ছিলেন। কিন্তু কোনো কিছু দিয়ে তারা প্রমাণ করতে পারেনি যে, মুজাহিদ কোথাও গিয়েছেন, পরিকল্পনা করেছেন ও অপরাধে অংশ নিয়েছেন। আমরা আশাবাদী মামলার গুণগত দিক বিচার করে আদালত মুজাহিদকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেবেন। এর আগে ৪ জুন আইনজীবীর মাধ্যমে মুজাহিদ ট্রাইব্যুনালে বলেন, দেশ এবং দেশের সংবিধানের প্রতি সব সময়ই আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। রাজনৈতিক কারণেই আজ আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা দেয়া হয়েছে। আমি আজ এই ট্রাইব্যুনালের সামনে দাঁড়িয়ে একটি কথাই বলতে চাই, আমি ন্যায় বিচার প্রত্যাশী। আমি আপনাদের কাছে নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার চাই। মামলার বিচারিক কার্যক্রম: ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার হন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় ২০১১ সালের ২১ জুলাই তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা। এরপর ২ আগস্ট তাকে ট্রাইব্যুনালে গ্রেফতার দেখানো হয়। গত বছরের ২১ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৭টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। মুজাহিদের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ আগস্ট শাহরিয়ার কবিরের সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এরপর এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকসহ মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। অপরদিকে মুজাহিদের পক্ষে প্রথম এবং একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তার ছোট ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর। গত ২২ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলে আসামিপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৫ মে দিন ধার্য করে দেন ট্রাইব্যুনাল। উভয়পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ৭ মে থেকে ১৬ মে পর্যন্ত মোট চার দিবসে মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর আসামিপক্ষে সৈয়দ মিজানুর রহমান ও মুন্সি আহসান কবির যুক্তি উপস্থাপন করেন। গত ২ জুন থেকে ৪ জুন পর্যন্ত আইনি বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও তার ছেলে ব্যারিস্টার এমরান সিদ্দিকী।