সাফাই সাক্ষী কাইয়ুম রেজা চৌধুরী

একাত্তরের ২৯ মার্চ সালাহউদ্দিন কাদেরকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেই

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি’র পক্ষে তৃতীয় সাফাই সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার খালতো ভাই কাইয়ুম রেজা চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দেয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমি ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে তার বাসা থেকে গাড়িতে তুলে তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে দিই। ঐ বছরের ১০ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী করাচিতে সালমান এফ রহমানের বাসায় এসেছিল। তবে সেদিন আমি বাইরে থাকায় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা শুরু করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আজ বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। জবানবন্দির শুরুতে ব্যবসায়ী কাইয়ুম রেজা চৌধুরী তার পরিচয় ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমার পিতা মরহুম মোর্তজা রেজা চৌধুরী ১৯৪৭ সালের পূর্বে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং বেঙ্গল রেজিসলেটিভ এ্যাসেমব্লির সদস্য ছিলেন। তিনি সৈয়দ আজিজুল্লাহ সাহেবের বড় জামাতা হওয়ার কারণে ফজলুর রহমান এবং ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তার দুই শ্যালিকার বিয়ে দেন। তত্কালীন সময়ে তারাও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আমার পিতা অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং সেই কারণে তিনি করাচিতে থাকতেন। ইস্কান্দার মির্জা মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত করলে আমার পিতাকে কলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসাবে নিয়োগ করা হয়। ১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আতাউর রহমান খান আমাদের কলকাতার বাসায় এসেছিলেন এবং সেই সময় আমার নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়। জবানবন্দিতে কাইয়ুম রেজা চৌধুরী বলেন, ১৯৫৮ সালের ১০ অক্টোবর আমার পিতার মৃত্যুর পরে আমরা ঢাকায় ফিরে এসে বসবাস করতে শুরু করি। ১৯৬৪ সালে আমি সেন্ট জোসেফ হাইস্কুল ছেড়ে শাহীন স্কুলে ভর্তি হই। এই শাহীন স্কুলে আমার সঙ্গে শেখ কামাল এবং নিজাম আহমেদের (আসামিপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী) সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। এই স্কুলে পড়াশুনার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ কামাল এবং নিজামকে গাড়িতে করে স্কুলে পৌঁছে দেয়ার জন্য আসতেন। আমি এবং শেখ কামাল খেলাধুলায় পারদর্শী থাকার কারণে আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ ছিল, যদিও শেখ কামাল আমার চেয়ে এক ক্লাস নিচে পড়তো। তিনি বলেন, আমি শাহীন স্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাস করি। এরপর আমি ঢাকা নটর ডেম কলেজে ভর্তি হই। সেখানে সালমান এফ রহমান, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এবং নিজাম আহমেদও ভর্তি হয়। সালাহউদ্দিন কাদের ইন্টার কলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নটর ডেম কলেজের প্রতিনিধিত্ব করতেন। নটর ডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার সুবাদে আমার কাজিন সালমান এফ রহমান, সালাউদ্দিন কাদের এবং নিজাম আহমেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। নিজাম আহমেদের বন্ধুত্বের সুবাদে আমরা প্রায়শই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যেতাম। নিজাম আহমেদ এবং বঙ্গবন্ধু বাড়ির মধ্যখানে যাতায়াতের জন্য একটি ছোট্ট গেইট ছিল যা এখনও আছে। তিনি বলেন, নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় সালাহউদ্দিন কাদের ইস্কাটনের একটি বাসায় থাকতেন এবং সেখানে আমরাও যেতাম। আমরা নটর ডেম কলেজ থেকে এইচ.এস.সি. পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছয় দফা ও এগারো দফা আন্দোলনের জন্য উত্তাল ছিল। বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করলে আমরা তার মুক্তির জন্য আন্দোলন করি। সেই আন্দোলনে সালাহউদ্দিন কাদেরসহ আমরা সকলেই অংশগ্রহণ করি। সালাউদ্দিন কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডে আই.জি.পি. আলমগীর কবির সাহেবের বাসায় থাকতে শুরু করেন। ১৯৬৯ গণ আন্দোলনের সময় মিছিলে শহীদ আসাদকে যখন গুলি করা হয় তখন আমি, সালমান এফ রহমান ও সালাহউদ্দিন কাদের একটি গাছের পিছনে ছিলাম। নিজাম আহমেদ আসাদের দুই ফিট দূরে এবং খায়রুল বাশার সেই সময় রায়ট ভ্যানের উপরে ছিল। তিনি বলেন, ধানমন্ডিতে সালাহউদ্দিন কাদেরের বাসায় সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ আসতেন। মূল জায়গা ছিল আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাড়ি যেহেতু সেটা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে ছিলো। তিনি বলেন, খন্দকার আমিনুল হক বাদশা’র সুবাদে এবং অনুপ্রেরণায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়। আমার ইংরেজিতে দখল থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু আমাকে বাদশা ভাইয়ের সঙ্গে বিদেশি সংবাদিকদের দেখাশুনা ও অনুবাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত্রে বাদশা ভাই, নিজাম আহমেদ, নেওয়াজ আহমেদকে নিয়ে আমি গাড়ি চালিয়ে তত্কালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে প্রেস রিলিজ দেয়ার জন্য যাই। প্রেস রিলিজ দেয়ার পর আমি গাড়িতে ফেরত আসি। রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে একজন পাকিস্তানি সেনা বন্দুক তাক করে আমাদেরকে হোটেলের মধ্যে যেতে নির্দেশ দিল। আমরা হোটেলের মধ্যে আটকা পড়ি। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ শিথিল হলে আমি রাজশাহী হাউসে, নিজাম আহমেদ এবং তার ভাই তাদের বাসায় এবং বাদশা ভাই আত্মগোপনে চলে গেলেন। ২৮ মার্চ আমি ও নিজাম ধানমন্ডির ৮ নম্বর ব্রীজের কাছে আমাদের পূর্ব পরিচিত সুইডিস পরিবারের বাসায় উঠি। ঐ বাসাটি ছিল সালাহউদ্দিন কাদেরের বাসার দুই রাস্তা আগে। ২৮ মার্চ দুপুরের পরে আমি হেঁটে সালাহউদ্দিন কাদেরের ১৮ নম্বর রোডের বাসায় যাই। আমাকে দেখে সালাউদ্দিন কাদের বলল, আমি আগামীকাল করাচি যেতে চাই। এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে হবে। পরে ৩২ নম্বর রোডস্থ আমার বোন ফারাদি খানের বাসা থেকে দুলাভাইয়ের টয়োটা করোনা গাড়ি করে আমি সালাহউদ্দিন কাদেরের বাসায় যাই এবং তাকে গাড়িতে তুলে দুপুরে তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে দিই। ১৯৭১ সালের ৪ বা ৫ এপ্রিল শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার সময় আমাকে তার পরিবারের সদস্যদের দেখাশুনা করার জন্য অনুরোধ করেছিল। আমি আমার ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় গেলাম। সেখানে যাওয়ার পর মামি (বেগম মুজিব) আমাকে দেখে বললেন, বাবা তুমিই প্রথম আমাদের দেখার জন্য এখানে এসেছো। সেখানে শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ রেহানা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ড. ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন। মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে নিজাম আহমেদ এবং শেখ কামাল সেখানে উপস্থিত হয়, কারণ শেখ কামাল টুঙ্গিপাড়ায় যেতে পারেনি। তখন আমরা তিনটি গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদেরকে মালিবাগ চৌধুরী পাড়া থেকে ১ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডস্থ মিসেস বদরুন্নেছা আহমেদের বাড়িতে নিয়ে আসি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল সালমান এফ রহমান, নিজাম আহমেদ এবং আমি বিমানযোগে করাচি যাই এবং সেখানে গিয়ে সালমান এফ রহমানের বাসায় উঠি। আমি করাচি পৌঁছানোর দুইদিন পর আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য একটি বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। তখন সালাহউদ্দিন কাদের সালমান এফ রহমানের বাসায় এসেছিল। আমি বাইরে থাকায় সালাহউদ্দিন কাদেরের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।