ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের অধিকার
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৩, ২০:৫৩
বাংলাদেশ সরকার ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়াছে। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই আইনের খসড়া অনুমোদন করা হইয়াছে। এই আইনের উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বত্ব বা পেটেন্ট রাইট সংরক্ষণ করা। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট রাইটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে ঔদাসীন্য কিংবা সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে না পারায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু কিছু পণ্যের স্বত্বাধিকার হারাইয়াছে বলিয়া বিভিন্ন তথ্যসূত্রে প্রকাশ। আবহমানকাল ধরিয়া এই দেশের কৃষককুল বহু বিচিত্র জাতের ধানের আবাদ করিয়া আসিতেছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উত্কর্ষ এবং আধুনিকায়নের ফলে সেইসব দেশীয় ধানের বেশিরভাগই মাঠ হইতে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বাংলাদেশে অনেক ধানের বীজও সংরক্ষিত নাই। কোনো কোনো বীজধান বিদেশের সংরক্ষণাগারে। সুস্বাদু, সুগন্ধী এবং নান্দনিক নামের সেইসব ধানের স্বত্ব রক্ষা করা জরুরি, যদিও এরই মধ্যে কিছু কিছু জটিলতা দেখা দিয়াছে বলিয়া ইতিপূর্বে খবর ছাপা হইয়াছে। এমনই আরও বিবিধ সামগ্রী রহিয়াছে বাংলাদেশ যেইগুলির স্বত্বাধিকার দাবি করিতে পারে।
জামদানিসহ ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্যের পেটেন্ট রাইট অর্থাত্ মালিকানা স্বত্ব পাইবার জন্য বাংলাদেশ ইউনেস্কোর শরণাপন্ন হইবে। গত বত্সর ডিসেম্বরে সরকারি পর্যায়ে এইরকম সিদ্ধান্ত হইয়াছিল । বাংলাদেশর ফজলি আম, ইলিশ মাছ ও নকশি কাঁথার মালিকানাও চাইবে বাংলাদেশ। এক্ষণে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এতদসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের যে নীতিগত সিদ্ধান্ত হইয়াছে, নিঃসন্দেহে তাহা উত্সাহব্যঞ্জক। ইহা একটি ভাল সংবাদও বটে। আগেই বলা হইয়াছে যে, বর্তমান বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় নিজেদের জিনিসের পেটেন্ট রাইট যথারীতি সংরক্ষণ করিয়া রাখা না হইলে ভবিষ্যতে সমস্যা দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। যে কোনো পণ্য সময়ের ব্যবধানে একাধিক দেশে উত্পাদিত হইতে পারে। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আছে, যেইগুলির সাথে কোনো একটি দেশের নাম বিশেষভাবে জড়াইয়া আছে। যেমন স্বর্ণসূত্র পাট, মসলিন, জামদানি, ইলিশ মাছ, নিম প্রভৃতি যে বাংলাদেশের তাহা বলিতে গেলে সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পাটের জেনোম আবিষ্কার করিয়াছে। ইহাতে ঐতিহ্যবাহী এই কৃষিজ পণ্যের উপর বাংলাদেশের অধিকার আরও পাকাপোক্ত হইয়াছে। এমনই আরও অনেক শস্য, গাছপালা, ফলফলারি, মাছ ও প্রাণি এবং হস্তশিল্পজাত জিনিস রহিয়াছে, যেগুলি একান্তভাবেই বাংলাদেশের। যেমন, মুক্তাগাছার মন্ডা, কুমিল্লার রসমালাই, নাটোরের কাচাগোল্লা ইত্যাদি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত না হইলে ঐতিহ্যের দাবি হাতছাড়া হইয়া যাওয়া বিচিত্র নহে। ঠিক যেমনটি ঘটিয়াছে জামদানির বেলায়। আমাদের প্রতিবেশি ভারত ইতোমধ্যে পেটেন্ট রাইট নিজেদের করিয়া লইয়াছে। উল্লেখ্য, ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের হস্তশিল্প হিসাবে জামদানি ডব্লিউআইপিও-তে নিবন্ধিত হয়, যদিও উহা উপ্পাদা জামদানি নামে তালিকাভুক্ত হইয়াছে।
আশার কথা এই যে, বিলম্বে হইলেও বাংলাদেশ সরকার এই ব্যাপারে উদ্যোগী হইয়াছে। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য প্রণীত হইলে তাহা দেশীয় জিনিসের স্বত্ব রক্ষায় সহায়ক হইবে। কাজেই এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।