বিসিএস নামক সোনার হরিণ আর বৈষম্য

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(১) ধারা: ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(২) ধারা: ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ বাংলাদেশের খুব কম ক্ষেত্রই রয়েছে যেখানে সংবিধান মানা হয়, সংবিধান মানা হয় না রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজে, সাধারণ কাজ-কর্মে, মানা হয় না দলীয় কাজ-কর্মে, মানা হয় না বিচারিক কাজে, মানা হয় না শিক্ষা-সংস্কৃতিতে- এমনিভাবে জাতীয় জীবনের সর্বত্রই খুব কম মানা হয় আমাদের সংবিধানকে। অথচ যেই সংবিধান এ জাতি ক্রয় করেছে রক্তিম সাগরের বিনিময়ে। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে একটি প্রক্রিয়ায় এখান থেকে সরকারি চাকরি পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিসিএস হলো এ দেশের মেরুদণ্ড। একজন মানুষ যেমন মেরুদণ্ডহীন অবস্থায় উঠে দাঁড়াতে পারে না, ঠিক তেমনি বিসিএস-এর মাধ্যমে যদি মেধাবীদেরকে বাদ দিয়ে নেয়া হয় অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের, তাহলে এ রাষ্ট্রযন্ত্রটি ধীরে ধীরে পরিণত হবে অকেজো রাষ্ট্রে, হবে মেধাশূন্য। ফলে এ প্রিয় ভূমি আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। রবি বাবুর ভাষায়- পৃথিবীর দরখাস্তের দ্বিতীয় পাতায়ই রয়ে যাবে বাংলাদেশের নাম, প্রথম পাতায় আর উঠবে না। সুতরাং ভাবুন আমরা মেরুদণ্ডহীন অকেজো হয়ে থাকবো না-কি মেরুদণ্ডের সহিত সোজা হয়ে দাঁড়াবো? সময় কিন্তু ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমরা এক আজব দেশের (আজব দেশ বলতে নাজুক প্রশাসন ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে) আজব মানুষ (্্্আজব মানুষ বলতে বোঝানো হয়েছে প্রতিবাদের ভাষাহীন মানুষকে) বলেই যত সব উদ্ভট কিছুর জন্ম দিতে পারি নইলে বিসিএস-এর মতো সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কিভাবে শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা বরাদ্দ হয়! পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৫ লক্ষ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, এবং ২০ লক্ষ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লক্ষ (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী)। সে হিসেবে মোট জনসংখ্যার ১.১০ শতাংশ নৃগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষিত রয়েছে ৫%, ১.৪ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য ১%, ০.১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০%, কোটা এখানেই শেষ নয় রয়েছে নারী কোটায় ১০%, রয়েছে জেলা কোটায় ১০% ! তাহলে, মোট এই ৫৬% রয়েছে কোটায় বরাদ্দ আর বাকি ৪৪% রয়েছে কোটা ছাড়া যেখানে চাকরি পেতে লড়াই করতে হয় অন্য সবাইকে। যা একটি অযৌক্তিক নীতিই নয় বরং ক্ষমার অযোগ্য। পিএসসিসহ সবার কাছে আমার জানতে চাওয়া, এটি সংবিধান লংঘন নয় কি? এটি অবশ্যই সংবিধান ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট পরিপন্থী। মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা সম্মান করি এবং সবারই উচিত তাদের সম্মান করা কারণ, তাদের অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এ সোনার দেশ। হতে পেরেছি একটি স্বাধীন-স্বার্বভৌম দেশের মানুষ। আমরা মুক্তি পেয়েছি কলোনিয়াল শাসন থেকে। কিন্তু সে জন্য সর্বত্রই তাদের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সুবিধা দেয়া হচ্ছে স্কুল-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়েও। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে গেলে তাদের প্রাধান্য দেয়া হয় । দেয়া হয় নানা সুবিধা সেখানে কিন্তু কেউ কোনো দিন প্রতিবাদ করেনি। তাদের যদি আরও সুযোগ-সুুবিধা দেয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও দেয়া হোক। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদেরকে অনেক সুবিধা দিয়ে তাদেরকে দেশের জন্য যোগ্য করে তোলা হোক। কিন্তু দেশের একটি জাতীয় বিষয়ে সবারই সমান সুযোগ পাওয়া উচিত এটি কেউ অস্বীকার করতে পারে না। সুতরাং আমি মনে করি, আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়া সম্পূর্ণরূপে সঠিক এবং এ প্রতিবাদ অনেক দেরিতে হলেও তাদের এই প্রতিবাদের জন্য স্বাগত জানাই। তবে তাদের এ আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে তা হলো- তারা পুরোপুরি কোটা পদ্ধতি বাতিল চাইতে পারেন না। তারা যেটি দাবি করতে পারেন তা হলো কোটার সংখ্যা কমিয়ে আনতে চাপ দিতে পারেন সরকারকে। যেমন আদিবাসী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটার ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকতে পারে না। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ শতকরা ১৫-২০ ভাগ কোটা রাখা যেতে পারে, শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া অংশকে সামনে আনার জন্য। এতদিন চাপা ক্ষোভ ছিলো তা উস্কে দিয়েছে। আগের বিসিএস পরীক্ষায় তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে এই কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ করেছে কিন্তু এবার তা না করে ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পর্যায় থেকেই কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিল যাতে করে বৈষম্যের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। কারণ, এই কোটা সিস্টেম প্রয়োগ করার ফলে কেউ ৫০ নম্বরে পাস করেছে আবার কেউ ৮০-৮৫ নম্বর পেয়েও পাস করতে পারেনি। সুতরাং এটি সুস্পষ্টভাবেই একটি প্রহসন। এটি কখনোই কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ মেনে নিতে পারে না। একটি বিসিএসকে স্বপ্নে ধারণ করে একজন শিক্ষার্থী ২৫-২৭ বছর অতিক্রম করে, এই স্বপ্ন এত সহজে বিফলে যেতে দিতে কে চায়! মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার জিজ্ঞাসা, কেন ছাত্রলীগ এই আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন করেছে? কেন তারা পুলিশের ভূমিকা নেয়? অবশেষে বলতে চাই, যারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন চালিয়ে যান, কোটা পদ্ধতি যুক্তিসংগতভাবে সংস্কার করার পূর্ব পর্যন্ত এবং মনে রাখবেন, ছাত্র সমাজতো আপনাদের সাথে আছেই বরং পুরো জাতিও আপনাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করবে। লেখক :শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা