সিরাজগঞ্জে তাঁত ব্যবসায় মন্দা ঈদে শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রিতে ভাটা
মারুফা মির্জা, চৌহালী ও মো. সাইদুর রহমান, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৩, ২২:০৩
ঈদ মানেই তাঁতীদের ভাগ্য বদলের মৌসুম। প্রতিবছর এই সময়টাতে তাঁতীরা চড়া দামে শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রি করলেও সিরাজগঞ্জে এবার তার উল্টো চিত্র। পাইকারি হাটে কাপড় কেনা-বেচায় মন্দার কারণে তাঁতীদের ব্যবসাতেও নেই আগের সেই তেজিভাব। ঈদের আগে এমন মন্দা সময় এর আগে কখনো আসেনি তাদের। অথচ অন্যান্য বছর কাপড়ের এমন চাহিদা হতো যে হাটে নিয়ে যাবার আগেই ব্যাপারীরা তা বাড়ি থেকে কিনে নেয়ার জন্য ভিড় করতো। এ অবস্থায় ঈদনির্ভর এই ব্যবসায় জেলার ২০ হাজার তাঁতী প্রায় ২ শতাধিক কোটি টাকার অতিরিক্ত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশিয় পোশাকের পরিবর্তে ভারতীয় সালোয়ার-কামিজ তথা অন্যান্য পোশাকের কদরের কারণে জেলার তাঁতীদের এবার এমন দুরবস্থা।
সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প গড়ে ওঠে সেই ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে। আর এই অঞ্চলে এ শিল্প প্রথম স্থাপন করে মূলত ভারতীয় মুর্শিদাবাদের তাঁতীরা। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে যখন ইংরেজদের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হলে মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী মসলিন কাপড় তৈরির কারিগর তাঁতী সম্প্রদায়ের উপর ইংরেজরা চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। তখন ঐ তাঁতীরা ভয়ে পালিয়ে এসে তত্কালীন পাবনা জেলার যমুনা নদীর তীর সংলগ্ন এনায়েতপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। নদী পথে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ ও তাঁতপণ্য কলকাতা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে বিক্রির সুবিধার কারণে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তারা এখানে তাঁতের শাড়ি ও লুঙ্গি তৈরির ব্যবসা শুরু করে। সেই থেকে যুগোপযোগী নিত্যনতুন ডিজাইনের শাড়ি-লুঙ্গি, গামছা, ধুতি, থ্রিপিস তৈরি করে এই অঞ্চলের তাঁতীরা সমগ্র বাংলাদেশে সুনাম অর্জন করে। তাদের তৈরি কাপড়ের সুখ্যাতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। আর কিছু দিন পরেই মহিমান্বিত রমজানের ঈদ। ঐদিন দেশের ধর্মপ্রাণ নারী-পুরুষেরা নতুন পোশাক পড়ে মেতে উঠবেন আনন্দে। এদের অনেকেই তাদের নতুন পোশাকের তালিকায় রাখেন সিরাজগঞ্জের শাড়ি ও লুঙ্গি। এমন ধারণার ভিত্তিতেই সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহাজাদপুর, উল্লাপাড়া, কাজিপুর ও সদর উপজেলার প্রায় ২০ হাজার তাঁতী তাদের দেড় লাখ হস্ত ও ইঞ্জিন চালিত তাঁতে আধুনিক ডিজাইনের এসব কাপড় তৈরি করে যাচ্ছেন। অথচ এ বছর বাজার মন্দা, কাজের চাপও আর আগের মতো নেই। আগের মতো দিনরাত কাজ করতে হয় না তাদের। তাঁতীদের মাঝে তাই নেমে এসেছে হতাশা। আগামী ঈদ উদযাপন নিয়েও তাঁত শ্রমিকেরা রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। এমন কথাই জানালেন এনায়েতপুর থানার গোপিনাথপুর গ্রামের শাহআলম, নুরনবী, হজরত আলী মোল্লা। তাদের মতে, দেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার কারণেই তাঁত ব্যবসায় এই মন্দাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
উত্পাদিত শাড়ি-লুঙ্গি স্থানীয় এনায়েতপুর পাইকারি কাপড়ের হাটে নিয়ে ভিড় করছেন তাঁতীরা। তবে সেখানে বেচা-বিক্রি কম। গোপালপুরের ব্যবসায়ী হাজী আতিয়ার রহমান, রুপনাই গ্রামের হাজী বাবুল মিয়া, এনায়েতপুর গ্রামের হাজী পান্না, গোপিনাথপুর গ্রামের মজিবর রহমান এবং লাল মিয়া মোল্লা জানান, ঈদের বাজার হিসেবে বিক্রি নেই। অন্যান্য বছর আমাদের হাটে কাপড় আনাই লাগতো না। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যাপারীরা কাপড় কেনার জন্য তাদের বাড়িতে ভিড় করতো। আর এবার তার বিপরীত চিত্র।
এ অঞ্চলের তাঁতীরা অন্যান্য বছরের মত ঈদকে সামনে রেখে কাতান, সুতি, সিল্ক এবং জামদানি শাড়িতে এনেছেন নতুনত্ব। লুঙ্গিতেও আনা হয়েছে আধুনিকতা। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কম মূল্যে উত্পাদিত পোশাক বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। এতে অতিরিক্ত ২ শতাধিক কোটি টাকার অতিরিক্ত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হবে বলে জানালেন তাঁতীরা। তাঁত ব্যবসায়ী গৌতম সাহা, গোলাম আজম ও তফাজ্জল হোসেন বাবুল জানান, এবার তাদের একটি সিল্ক শাড়ি তৈরিতে খরচ পড়েছে ৩ হাজার ২শ টাকা। যা পাইকারি বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৩৫শ টাকায়। অথচ অন্যান্য বছর এই শাড়ি অনায়াসে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করা যেত। লুঙ্গির ক্ষেত্রেও একই দশা। ৩শ টাকা খরচে তৈরি লুঙ্গি বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৩৩০ টাকায়। এ অবস্থায় আমাদের মনে ঈদের আমেজ নেই। তবে বর্তমান তাঁত বাজারের এমন মন্দাভাবের জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি আর একটি কারণকে দায়ী করলেন সিরাজগঞ্জ জেলা হ্যান্ডলুম-পাওয়ারলুম ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ বদীউজ্জামান। তার মতে, মানুষের ভারতীয় সালোয়ার-কামিজসহ অন্যান্য পোশাক ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার কারণেই বর্তমানে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পের এই দুরবস্থা।