মুজাহিদের ফাঁসি
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৩, ২৩:০৭
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র, হত্যা, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনসহ মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিন অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড, এক অভিযোগে যাবজ্জীবন ও অপর এক অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। দুটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল বুধবার এ রায় ঘোষণা করে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় যাবজ্জীবন ও পাঁচ বছরের দণ্ড স্বাভাবিকভাবেই ভোগ করতে হবে না। এ সময় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মুজাহিদ কাঠগড়ায় একটি চেয়ারে বসে ছিলেন।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে আল বদরের নেতা হিসেবে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের প্রমাণ মিলেছে।
এগুলোর মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার ছয় নম্বর অভিযোগ (দৈনিক ইত্তেফাকের তত্কালীন কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণ ও নিখোঁজের এক নম্বর অভিযোগটি এর সঙ্গে যুক্ত) ও ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার হিন্দু-অধ্যুষিত বাকচরে কয়েকজনকে হত্যার সাত নম্বর অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে একক দণ্ড হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের পাক-আর্মি ক্যাম্পে আটক প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল, আজাদকে অমানবিক নির্যাতনের পাঁচ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রণজিত্ নাথকে নির্যাতনের তিন নম্বর অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া ফরিদপুরের তিনটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রামে হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের দুই নম্বর অভিযোগ ও গোয়ালচামট খোদাবক্সপুর গ্রামের মো. আবু ইউসুফকে নির্যাতনের চার নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে এই দুই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
গতকাল বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন এবং সদস্য বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক শাহিনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবী, শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য, পর্যবেক্ষক, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ, দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানরা। রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের প্রধান সমন্বয়কারী ও ভারপ্রাপ্ত এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম কে রহমান বলেছেন, রায়ে দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। যে রায়ের জন্য আমরা দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে অপেক্ষা করছিলাম। অপরদিকে আসামিপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা এ রায়ে ক্ষুদ্ধ। ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে তা ভুল ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। আন্তর্জাতিক আইন অনুধাবন করতে এবং এর সঠিক ব্যাখ্যা প্রদানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
এদিকে রায়কে অবিচার হিসেবে দাবি করেছেন মুজাহিদ নিজেই। রায় ঘোষণার পর কাঠগড়ায় মুজাহিদ বলেছেন, এটা অবিচার (ইনজাস্টিস)। ১৯৭১ সালে আমি কখনোই ফরিদপুরে ছিলাম না। ইসলামী আন্দোলনই আমার একমাত্র অপরাধ। এটা শতভাগ অবিচার।
জামায়াত-শিবিরের সকাল-সন্ধ্যা হরতালের মধ্যে গতকাল সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার ষষ্ঠ রায় ঘোষণার কার্যক্রম শুরু হয়। ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচার কক্ষে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচার কক্ষে রায় ঘোষণার জন্য বিচারকরা আসেন বেলা ১০টা ৪৮ মিনিটে। বিচারকরা আসন গ্রহণের ছয় মিনিট আগেই মুজাহিদকে কাঠগড়ায় আনা হয়। বিচারকরা আসন গ্রহণের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা ও এরপর সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন মহল থেকে রায় প্রত্যাখ্যানের ঘোষণার সমালোচনা করেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। পরে তিনি বলেন, মোট রায় হলো ২০৯ পৃষ্ঠার। কিন্তু সময় ও অন্যান্য দিক বিবেচনা করে রায়ের ৩৭ পষ্ঠার সারাংশ পাঠ করা হবে। এরপর ১১টা ২ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন বিচারক শাহিনুর ইসলাম। একে একে বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও ওবায়দুল হাসান রায়ের সারাংশ পড়েন। পৌনে ১টার দিকে মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের সারাংশে মামলার বিচার কার্যক্রম, অভিযোগ, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের যুক্তি, সাক্ষীদের জবানবন্দি, বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। রায়ে বিশেষভাবে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী ও আল বদরের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর মুজাহিদের মামলা নিয়ে মোট ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগের রায়ে জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত রুকন পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আর জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ৯০ বছর ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে আরো পাঁচজনের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
যে দুই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড
রাষ্ট্রপক্ষের আনা এক, ছয় ও সাত নম্বর অভিযোগে মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছয় নম্বর অভিযোগটি হলো বুদ্ধিজীবী হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার। অন্যদিকে এক নম্বর অভিযোগটি হলো দৈনিক ইত্তেফাকের তত্কালীন নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর রাত তিনটার দিকে অপহরণ ও হত্যার। এ অভিযোগটি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অংশ হওয়ায় এটিকে ট্রাইব্যুনাল ৬ নম্বর অভিযোগের সঙ্গে একীভূত করেছেন।
৬ নম্বর অভিযোগে বিচারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে রায়ে বলা হয়, মুজাহিদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ তিনি আল বদরের দুষ্কর্ম ও অপরাধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এছাড়া তিনি আল বদর বাহিনীর ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বে ছিলেন। আল বদর সদস্যদের ওপর তার কর্তৃত্ব ছিলো এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথ্য প্রমাণে দেখা গেছে, তিনি কয়েক বার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল টেনিং কলেজে আল বদর ক্যাম্প পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি ভারতের এজেন্ট ও দুষ্কৃতকারী বলে মুক্তিযোদ্ধাদের খতম করার জন্য আল বদর সদস্যদের উস্কানি দেন। রায়ে বলা হয়, নাত্সী বাহিনীর এডলফ আইকম্যান কাউকে নিজ হাতে খুন করেননি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাত্সী বাহিনীর নৃশংসতার অন্যতম সংগঠক তিনি ছিলেন। এ অপরাধে পরে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে বিভিন্ন পেশার কয়েকশ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। ১৯৭২ সালে ৫ জানুয়ারি দৈনিক অবজারভারের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িতরা কুখ্যাত আল বদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। আল বদরদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে আল বদর সদস্যদের হিযরত করতে বলেন। এরপর ১০ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে আল বদরের সদস্যরা। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল বুঝতে সক্ষম হয়েছে আচরণ, বক্তব্য ও বিবৃতির মাধ্যমে এ পরিকল্পনার সঙ্গে মুজাহিদের সম্পৃক্ততা ছিলো। সাক্ষ্য ও দালিলিক তথ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে মুজাহিদ বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গণহারে বুদ্ধিজীবী হত্যা একটি ‘এক্সটারমিনেশন’ যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’ ১৯৭৩ এর ৩ (২) (ক) (চ) ধারার অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ। এছাড়া এতে মুজাহিদের নৈতিক সমর্থনও ছিলো। তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায় রয়েছে। এজন্য তাকে ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯৭৩ এর ৩ (২) (ক) (চ) ধারার অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে ২০(২) ধারায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
সাত নম্বর অভিযোগে একাত্তরের ১৩ মে বেলা দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে রাজাকার কালু বিহারি, ওহাব, জালাল ও অন্যদের সঙ্গে মুজাহিদ গাড়ি (জিপ) করে ফরিদপুরের কোতোয়ালী থানার খলিলপুর বাজারে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে যান। সেখানে সভার পর মুজাহিদ সঙ্গীদের নিয়ে হিন্দু-অধ্যুষিত বাকচর গ্রামে হামলা চালান। মুজাহিদের নির্দেশে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়।
এ অভিযোগে বিচারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে রায়ে বলা হয়, মুজাহিদ নিজে এ অপরাধ করেছেন তা নয়। দুষ্কৃতকারীদের একটি দল এ অপরাধ করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের ১২তম সাক্ষী বলেছেন, এডভোকেট আফজালসহ কয়েক জন রাজাকারকে সাথে নিয়ে মুজাহিদ হিন্দু-অধ্যুষিত বাকচর গ্রামে হামলা চালান। ১৩তম সাক্ষী বলেছে মুজাহিদ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মুজাহিদের হাতে অস্ত্র ছিলো। এর মাধ্যমে এ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে তার নির্দেশে অনেককে হত্যা করা হয়, ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হয়। ছাত্রসংঘে তার অবস্থান এ হত্যাকাণ্ড সংগঠনে ভূমিকা রেখেছে। সব দিক বিবেচনায় অভিযুক্ত এ অপরাধের জন্য সহযোগী ও সহ-দুষ্কৃতকারী হিসেবে দায়ী। এছাড়া হামলার কারণে অনেক হিন্দু দেশত্যাগে বাধ্য হয়। এ কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আইনের ৪(১) ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ২০(২) ধারায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
যে দুই অভিযোগে কারাদণ্ড:
রাষ্ট্রপক্ষের আনা ৫ নম্বর অভিযোগে মুজাহিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩০ আগস্ট রাত আটটার দিকে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি মুজাহিদ ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের পাক-আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল, আজাদকে দেখে তারা গালিগালাজ করেন। মুজাহিদ একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে এদের মেরে ফেলতে হবে। পরে তাদের অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করেন। তাদের কারও মরদেহও পাওয়া যায়নি। এ অভিযোগে বিচারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে রায়ে বলা হয়, এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ড হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী জহির উদ্দিন জালাল এ ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। মুজাহিদ রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে উপরোক্ত ব্যক্তিদের মেরে ফেরার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এতে বোঝা যায়, এ অপরাধের বিষয়ে মুজাহিদের ধারণা ছিলো। এছাড়া তিনি এ ঘটনায় নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। এদের ক্যাম্পে নেয়ার আগে আল বদর সদস্যরা আটক করে এবং থানায় সোপর্দ করে। ছাত্র সংঘের নেতা হওয়ায় মুজাহিদের আল বদরের উপরের প্রভাব ছিলো। তার পরামর্শ প্রমাণ করে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য মুজাহিদ দায়ী। রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় ও পঞ্চম সাক্ষীর সাক্ষে মুজাহিদের হিংস্র কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিলো। ছাত্র সংঘ ও আল বদরের নেতা হওয়ায় তার এ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ অভিযোগে মুজাহিদের অংশগ্রহণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে। এজন্য তাকে ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯৭৩ এর ৩ (২) (ক) (চ) ধারার অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে ২০(২) ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া তিন নম্বর অভিযোগে মুজাহিদকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজাকাররা ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রণজিত্ নাথ ওরফে বাবু নাথকে খাবাসপুর মসজিদের কাছ থেকে ধরে পুরাতন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত মুজাহিদের ইঙ্গিতে রাজাকার ও অবাঙালিরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে জনৈক আবদুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে আটকে নির্যাতন করে। রাতে রণজিত্ পালাতে সক্ষম হন। এ অভিযোগে বিচারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে রায়ে বলা হয়, সেনা ক্যাম্পে যাওয়া মুজাহিদের অবস্থান ও কর্তৃত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করে। ‘ইসকো হাটাও’ (এখান থেকে সরাও) মুজাহিদের এ ধরনের বক্তব্যে আদেশ বা নির্দেশকে বোঝায়। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলতে পদ্ধতিগত অপরাধ ও গ্রুপ অপরাধকে বোঝায়। এ ধরনের অপরাধে সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে তার কোনো মানে নেই। এ অপরাধে মুজাহিদও দায়ী। এজন্য তাকে ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯৭৩ এর ৩ (২) (ক) (চ) ধারার অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে ২০(২) ধারায় পাঁচ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
যে দুই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি:
মুজাহিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা সাত অভিযোগের মধ্যে ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছিলো, একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি মুজাহিদসহ কয়েকজন অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুরের তিনটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গিতে হামলা চালায়। ওই হামলায় ৫০ থেকে ৬০ জন হিন্দু নিহত হন। তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ২৬ জুলাই সকালে গোয়ালচামট খোদাবক্সপুর গ্রামের জনৈক মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে রাজাকাররা অপহরণ করে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে মুজাহিদ সেখানে গিয়ে এক পাকিস্তানি মেজরকে কিছু বললে ইউসুফের ওপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু হয়। তিনি সেখানে এক মাস তিন দিন আটক থেকে নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে তাকে যশোর সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়। নির্যাতনের ফলে আবু ইউসুফ পাখির বুকের ও পিঠের হাড় ভেঙে যায়। সাক্ষ্য ও দালিলিক প্রমাণ ও যুক্তির্কের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ এ দুটি অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তাই তাকে এ দুটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
আল বদরের নেতা হিসেবে মুজাহিদের ঊর্ধ্বতন অবস্থান:
রায়ে বলা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায় বেসামরিক নেতাদের ওপরও বর্তায়। কারণ, অধস্তন বা প্রকৃত অপরাধীদের ওপর তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকে। এটা সামরিক কমান্ডারদের মতোই। এক্ষেত্রে সামরিক কমান্ডারদের মতো অধিনস্তদের উপর ডিসিপ্লিনারি ক্ষমতা ও কমান্ড অবস্থান বেসামরিক ব্যক্তিদেরও থাকবে তা জরুরি নয়। এছাড়া ঊর্ধ্বতন অবস্থান দেখানোর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা ডকুমেন্টেরও প্রয়োজন নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ৪ এর ২ ধারায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের অপরাধের বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো কমান্ডার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সুপিরিয়র অফিসার) যে নির্দেশ দেয়, অনুমতি দেয়, সায় দেয় বা বিনা আপত্তিতে মেনে নেয় অথবা মানবতাবিরুদ্ধে যায় এমন অপরাধ সংগঠনে অংশ নেয়া, অথবা এ ধরনের কোনো অপরাধ সংগঠনের পরিকল্পনায় বা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকে অথবা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে তার যে দায়িত্ব তা পালনে ব্যর্থ হয় বা সম্পাদন করতে পারে না, অথবা তার অধীনে বা থাকা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ বা তত্ত্বাবধান করতে ব্যর্থ হয়, ঐসব ব্যক্তি বা অধীনস্তরা বা তাদের কেউ যদি কোনো ধরনের অপরাধ করে এবং এ ধরনের অপরাধ রোধে যদি কেউ ব্যর্থ হয় তবে সে ঐ অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হবেন।
ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা হওয়ার কারণে আল বদরের উপর তার কর্তৃত্ব ছিলো। বিভিন্ন সময় তিনি আল বদর সদস্যদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ আরো কিছু ঘটনা প্রমাণ করে আল বদরের উপর তার প্রভাব ছিলো। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বে থাকায় অধীনস্তদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তার ধারণা ছিলো। রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে ১৯৭১ সালে আল বদরের উপর তার কর্তৃত্ব ছিলো এবং তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণ:জামায়াতের সশস্ত্র শাখা আল বদর
রায়ের পর্যবেক্ষণে ১৯৭১ সালে গঠিত আল বদরকে জামায়াতের সশস্ত্র অঙ্গসংগঠন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীদের দিয়েই আল বদর গঠিত হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কার্যকারিতা বাড়ানো ও স্থায়িত্বের জন্য আল বদরসহ দুটি আধা-সামরিক বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আল বদর ও আল শামস্ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করা হতো। আল বদরের হত্যাকাণ্ড, নৃশংসতা অবর্ণনীয় নির্যাতনের জবাবদিহিতা থেকে জামায়াত কখনোই মুক্তি পাবে না। এই আল বদর জামায়াতের একশন সেকশন, ফ্যাসিস্ট বডি এবং আর্মড উইং হিসেবে ১৯৭১ সালে কাজ করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের কী ভূমিকা ছিলো তা ঐ সময়ে নৃশংসতার শিকার ব্যক্তিদের জানার অধিকার রয়েছে।
পর্যবেক্ষণে হুসেন হাক্কানি’র মস্ক এন্ড মিলিটারি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলা হয়, আল বদর পাকিস্তান আর্মির ডেথ স্কোয়াড হিসেবে কাজ করেছিলো। যারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলো।
মামলার বিচার প্রক্রিয়া:
ফরিদপুরের কোতয়ালি থানাধীন পশ্চিম খাবাশপুর গ্রামের মওলানা আবুল আলীর ছেলে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় ২০১১ সালের ২১ জুলাই তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা। এরপর ২ আগস্ট তাকে ট্রাইব্যুনালে গ্রেফতার দেখানো হয়। গত বছরের ২১ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৭টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। মুজাহিদের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ আগস্ট শাহরিয়ার কবিরের সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এরপর এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকসহ মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। অপরদিকে মুজাহিদের পক্ষে প্রথম এবং একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তার ছোট ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর। গত ২২ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলে আসামিপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৫ মে দিন ধার্য করে দেন ট্রাইব্যুনাল।
উভয় পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ৭ মে থেকে ১৬ মে পর্যন্ত মোট চার দিবসে মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর আসামিপক্ষে সৈয়দ মিজানুর রহমান ও মুন্সি আহসান কবির যুক্তি উপস্থাপন করেন। গত ২ জুন থেকে ৪ জুন পর্যন্ত আইনি বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও তার ছেলে ব্যারিস্টার এমরান সিদ্দিকী।
ট্রাইব্যুনাল ঘিরে কড়া নিরাপত্তা:
এদিকে, রায়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি এলিট ফোর্স সোয়াত বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও সাধারণ পোশাকে গোয়েন্দারাও ছিল সক্রিয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালের সবগুলো প্রবেশপথ ও আশপাশের পুরো এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের মূল প্রবেশপথে অবস্থান নেয় বিজিবি’র সদস্যরা। আর র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা রয়েছে শিশু একাডেমীর সামনে দিয়ে ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় গেটসহ সংলগ্ন এলাকায়।