দুর্নীতিবাজ ৪৮৬ চিকিত্সকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৩, ২৩:১১
অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত তিন বছর ৪৮৬ জন চিকিত্সকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জেলা ও উপজেলায় দায়িত্বে থাকাকালীন ওই চিকিত্সকরা সরকারি ওষুধ পাচার, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি এবং সরকারি নানা জিনিষপত্র ক্রয়ে দুর্নীতি করেছিলেন। কয়েকজন নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতেন না। অভিযুক্ত চিকিত্সকদের মধ্যে সিভিল সার্জন থেকে শুরু করে মেডিক্যাল অফিসার পদমর্যাদার চিকিত্সক রয়েছেন। শুধু সিভিল সার্জনই রয়েছে ৫০ জনের বেশি।
এসব অভিযোগে ২০১০ সালে ১২৫ জনের বিরুদ্ধে, ২০১১ সালে ২৪৭ জনের ও ২০১২ সালে ১১৪ জন চিকিত্সকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এদের মধ্যে ১৭৫ জন চিকিত্সকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গুরুতর।
এবারই প্রথম অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এতো বেশি সংখ্যক চিকিত্সকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো। স্বাস্থ্য মন্ত্রলালয় ও অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে চিকিত্সকদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিএমএ) চিকিত্সকদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে বাধা আসতো। যার ফলে চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেত না। কিন্তু এবার সব ধরনের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েতউল্লাহ বলেন, তিন বছরে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এত সংখ্যক ডাক্তারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এটি একটি রেকর্ড। যা অতীতে কখনোই সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগে কেউ অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ফলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম এবং কর্মস্থলে চিকিত্সকদের অনুপস্থিতি অনেক কমে গেছে বলে তিনি জানান।
জানা গেছে, ঢাকার তেজগাঁও কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের সাব সেন্টারের নামে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ওই ওষুধ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাক ভর্তি ওই ওষুধ মিডফোর্ডের চোরাই মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেয়া হতো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে বলেন, এভাবে ওষুধ বিক্রির সঙ্গে এক শ্রেণীর সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ও স্টোর কিপাররা জড়িত।
জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কিছু চিকিত্সক নেতা নিয়োগ, বদলি, টেন্ডারবাজি ও কেনাকাটার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই নেতাদের ‘চাপে’ কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম বহির্ভূত কাজ করতে হয় বলে কয়েকজন সিভিল সার্জন নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন। তাদের মতে শুধু এ সরকারের আমলেই নয় বিগত সরকারের আমলেও নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার, কেনাকাটা ও পদোন্নতি দলীয় চিকিত্সক নেতাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হতো। বর্তমানেও একই অবস্থা। কোন কোন সংসদ সদস্য এ বিষয়গুলো নিজেই দেখেন। সংসদ সদস্যদের মতের বাইরে যাওয়া চিকিত্সকদের জন্য কঠিন।
বেশির ভাগ জেলা-উপজেলার চিকিত্সকরা বেশিরভাগ সময়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। তারা রাজধানী বা বিভিন্ন শহরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত। দুই সপ্তাহে একবার অথবা মাসে একবার হাসপাতালে গিয়ে তারা স্বাক্ষর করে চলে আসেন।
মন্ত্রণালয়ের ও অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা বলেন, বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনগণ এক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। ঢাকার বাইরের বেশিরভাগ ডাক্তার সরকারি হাসপাতালে বসেই প্রাইভেট প্রাকটিস করেন। অপরদিকে হাসপাতালে ডিউটি না করে সকাল-সন্ধ্যা প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিত্সা ও অপারেশন করেন। এই টাকার ভাগ যায় বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের পকেটে। এই কারণে সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা না দিয়ে চিকিত্সকরা সারাক্ষণ প্রাইভেট প্রাকটিস করার সুযোগ পাচ্ছেন। মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে কর্মকর্তারা তদন্তে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলায় গিয়েও এর প্রমাণ পেয়েছেন। অভিযুক্ত কয়েকজন সিভিল সার্জন ইত্তেফাককে বলেন, বিভাগীয় পরিচালকরাই নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি নরসিংদী সদর হাসপাতালের স্টোর কিপার মফিজ বিপুল পরিমাণ ওষুধ সামগ্রী পাচার করার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। একদিন পুলিশের হেফাজতে থাকার পর মোটা অংকের টাকায় রফাদফা করে নরসিংদীর সদর হাসপাতালের এক চিকিত্সক তাকে ছাড়িয়ে নেন। সেখানে এক চিকিত্সক নেতা সাপ্লাইয়ের কাজে এক ঠিকাদারের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেন। বিএমএর ইফতারির চাঁদা দিতে হবে বলে ওই নেতা ওই সরবরাহকারীর কছে উেকাচ দাবি করেন। অন্যথায় ওই সরবরাহ কাজ বন্ধ করে দেবেন বলে হুমকি দেন। মূলত ওই নেতার কাছে নরসিংদীর সিভিল সার্জন অফিস জিম্মি। বিএমএর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, বিএমএর স্থানীয় নেতা কিংবা অন্য কোন সংগঠনের কোন ডাক্তার বিএমএর নামে চাঁদাবাজি অথবা অন্য কোন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
নরসিংদী সদর হাসপাতালের এক কনসালট্যান্ট একই স্থানে রয়েছেন ২০ বছর ধরে। তার বাড়িও নরসিংদীর সদর উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নে। তিনি রাজধানী ঢাকায় সপরিবারে বাস করেন। সপ্তাহে একদিন সদর হাসপাতালে যান। মাঝে মাঝে যানও না।
এক কর্মকর্তা বলেন, তিনি এখানকার স্থানীয় লোক। এজন্য ব্যাপক প্রভাব তার ওই হাসপাতালে। তার অনেক অনিয়ম দেখেও আমরা দেখি না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা বলেন, কোন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা তার নিজ জেলা ও উপজেলায় চাকরি করতে পারেন না। ওই কর্মকর্তা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তার নিজ এলাকায় অবস্থান করছেন বলে উক্ত কর্মকর্তারা জানান। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০ বছর নিজ এলাকায় তিনি চাকরি করতে পারছেন কারণ যে সরকার ক্ষমতায় আসে তিনি সেই সরকারের দলীয় লোক সেজে যান।