নতুন শ্রম আইন নিয়ে সন্তুষ্ট নয় কোন পক্ষই

সমপ্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইনের সংশোধনী নিয়ে মালিক-শ্রমিক কোন পক্ষই সন্তুষ্ট নয়। সন্তুষ্ট নয় শ্রমিক অধিকার সংগঠনও। নতুন আইনের দুই একটি বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি ধারায় শ্রমিকদের স্বার্থে বিশেষ কোন পরিবর্তন আসেনি বলেই মনে করছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রচলিত রীতির সাথে আইনের কয়েকটি ধারা এখনো সাংঘর্ষিক। এই আইন শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া ও দর কষাকষির অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর ইতিবাচক কোন প্রভাব ফেলবে না। অন্যদিকে মালিকপক্ষ বলছে, কোন কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন হবে অথচ মালিক জানবে না। এটি হতে পারে না। এই ট্রেড ইউনিয়ন কারখানার ভালো হতে পারে নয়তো ধ্বংসও ডেকে নিয়ে আসতে পারে। তবে উভয় পক্ষই এই আইনের সংশোধনীকে ‘মন্দের ভালো’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। নতুন আইনে কারখানা শ্রমিকদের জন্য মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের জন্য কল্যাণ তহবিলে দান করলেও এখানে শতভাগ রপ্তানি খাতকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবির মুখেও ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য ৩০ শতাংশ শ্রমিকের লিখিত আবেদন রাখার বাধ্যবাধকতার বিধান পরিবর্তন করা হয়নি। শ্রমিকদের দাবি ছিল এটি ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। তবে ট্রেড ইউনিয়ন করতে আগে কারখানার মালিককে জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও নতুন আইনে তা বাদ দিয়ে শুধু ট্রেড ইউনিয়ন অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষকে জানানোর বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়াও ছোটখাট আরো কিছু পরিবর্তন মিলিয়ে ৮৭টি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শ্রমিকের সংজ্ঞায় নতুন কয়েকটি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এর সভাপতি রায় রমেশ নতুন আইনের বেশকিছু অসঙ্গতি তুলে ধরে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কিছু বাধা দূর করা হলেও ৩০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এটা আইএলও’র প্রচলিত রীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া আইএলও’র রীতি হচ্ছে, স্বাধীনভাবে নেতা নির্বাচনের সুযোগ। কিন্তু আইনে বলা হয়েছে, কারখানার কর্মীদের মধ্য থেকেই নেতা নির্বাচন করতে হবে। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ নেতা বাইরে থেকে নির্বাচন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি রাখা হয়েছে ৪ মাস। অথচ সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই সুযোগ ৬ মাসের জন্য। অর্থাত্ একই দেশে একই বিষয়ে দুই রকম আইন। অন্যদিকে মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিলে রাখার বাধ্যবাধকতা থেকেও শতভাগ রপ্তানিমুখী কারখানাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অথচ পাকিস্তান আমল থেকে এ আইন ছিল। এছাড়া শ্রমিকের সংজ্ঞায় সকল শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত না করায়ও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, যিনি শ্রম বিক্রি করেন, তিনিই তো শ্রমিক। শ্রম আইনের শ্রমিকের সংজ্ঞায় তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল। এটি মালিক শ্রমিক উভয়পক্ষের জন্যই ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি। সব মিলিয়ে নতুন আইন ‘মন্দের ভালো’। অন্যদিকে নতুন শ্রম আইনে কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে মালিককে জানানোর বাধ্যবাধকতা না থাকার ধারা যুক্ত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমার কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন হয়ে যাবে, অথচ আমি জানলাম না। এটা কেমন কথা?’ তিনি বলেন, ‘এই ট্রেড ইউনিয়ন হয় গার্মেন্টস খাতকে উপরে উঠাবে নয়তো শেষ করে দেবে। আমরা অবশ্যই ট্রেড ইউনিয়ন চাই। সেটি অবশ্যই শ্রমিক ও মালিকের স্বার্থে হতে হবে।’ এদিকে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে মালিককে জানাতে হবে না-এমন বিধানে আখেরে শ্রমিকদের লাভ হবে না বলেই মনে করেন শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো: নাসিম। তিনি বলেন, মালিকপক্ষ কোন না কোনভাবে এই তথ্য জানবে। তখন ওই শ্রমিকদের ছাঁটাই করলে তাদের দায়ী করে আইনগত প্রতিকার চাওয়া যাবে না। গতকাল নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে নতুন শ্রম আইনে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার পদক্ষেপ স্থবির করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক অধিকার সংগঠনের বরাত দিয়ে নতুন শ্রম আইনের বেশকিছু অসঙ্গতি তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। নতুন শ্রম আইন শ্রমিকদের পুরোপুরি স্বার্থ রক্ষা করবে না এবং আইনটি আন্তর্জাতিক মানের হয়নি বলে ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। নতুন আইনটি সংসদে পাস হওয়ার পর নিউইয়র্ক ভিত্তিক এই সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে কিছুটা অগ্রগতি হলেও শ্রমিকের অধিকার এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে। দাতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উচিত আবার শ্রম আইন সংশোধনে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করা। শ্রমিকদের ইউনিয়ন করা এবং নিরাপদে কাজ করার অধিকার আইনে থাকতে হবে। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, শ্রম আইন আন্তর্জাতিক মানের হলে সরকারের জন্য সুখবর ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সরকার শ্রমিকদের অধিকার সীমিত করে দিয়েছে। রানা প্লাজা ধসের বিপর্যয় থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে সরকার চেষ্টা করছে। তাই তারা দেখাচ্ছে যে, সরকার শ্রমিকদের অধিকারের দিকে খুব নজর দিচ্ছে।