সম্পত্তি হস্তান্তর করের এক শতাংশ উপজেলা তহবিলে জমার আদেশ
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৩, ২৩:১৮
প্রায় চার বছরের বেশি সময় পর স্থানীয় স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর কর বাবদ এক শতাংশ হারে টাকা উপজেলা পরিষদে জমা করার বিষয়ে সরকারি আদেশ জারি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার স্থানীয় সরকার বিভাগ এ আদেশ জারি করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে বাস্তবায়িত এ সিদ্ধান্তের ফলে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা খুশি হবেন-এই আশায় সরকার এমনটি করলেও অন্য অন্তত দুটি কারণে চেয়ারম্যানরা এখনো অখুশি রয়েছেন যার প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়বে। এ দুটি কারণ হচ্ছে প্রথমত উপজেলা পরিষদকে এমপিদের খবরদারি মুক্ত না করা এবং হস্তান্তরিত সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বেতন-ভাতাদি পরিষদের ওপর ন্যস্ত না করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে তাদেরকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সে জন্য স্থানীয় ভূমি সম্পত্তি আয়ের এক শতাংশ পরিষদকে দেয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। তবে আইন প্রণেতা তথা এমপিদেরকে পরিষদের উপদেষ্টার পদ থেকে অপসারণ করা না হলে এবং হস্তান্তরিত মন্ত্রণালয়-বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা পরিষদকে দেয়া না হলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দুর্বলতা থেকে যাবে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান ইত্তেফাককে বলেন, ক্রমান্বয়ে সকল যৌক্তিক ও আইনি দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে স্থানীয় শাসনের বয়স খুব বেশি নয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এ ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে একটু সময় লাগছে। তবে ধীরে ধীরে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার সব ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সাবেক সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান ইত্তেফাককে বলেন, শুধু স্থানীয় আয়ের কর প্রাপ্তির সুযোগ দিলেই হবে না। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না করায় গণতন্ত্র আজ শক্তিশালী হতে পারছে না। স্থানীয় উন্নয়নে এমপিদের ভূমিকা রাখার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে পরিষদে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু হয়ে মাঠ প্রশাসন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। স্থানীয়ভাবে দলাদলি বেড়েছে। এ অবস্থায় সরকারি কর্মকর্তারাও আইন মেনে কাজ করতে পারছে না। ফলে আইনের শাসনও দুর্বল হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিষদকে কার্যকর করতে হলে প্রথমেই এমপিদের পরিষদের উপদেষ্টার পদ থেকে সরাতে হবে। এর পর সরকারের সদিচ্ছা দরকার হবে। এখন যেভাবে চলছে-তাতে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মফস্বল এলাকায় ভূমি রেজিস্ট্রেশনে জমির মূল্যের ওপর নিবন্ধন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক, স্থানীয় সরকার কর বাবদ ৮ শতাংশ হারে আদায়ের প্রচলন রয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী উপজেলা এলাকাভুক্ত সম্পত্তি হস্তান্তর বাবদ নিবন্ধন ফির ১ শতাংশ উপজেলা পরিষদের হিসাবে জমা করার কথা। ২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে এ প্রস্তাবটি অর্থ বিভাগে পড়ে ছিল। সমপ্রতি তা অনুমোদন দেয়ায় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গতকাল গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সূত্র জানায়, সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করার বাধাসমূহ চিহ্নিত করে এ সম্পর্কে করণীয় নির্ধারণসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দেয়া হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ এ বিষয়ে গত ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠায়। এখনও এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা না পাওয়ায় তা ঝুলে আছে। গত ২২ এপ্রিল হস্তান্তরিত সব বিভাগের কাজের আর্থিক অনুমোদন এবং সকল কর্মকর্তার বেতন-ভাতা পরিষদের তহবিলে ন্যস্ত করার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি এখনো সবকিছু পরীক্ষ-নিরীক্ষা শেষ করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দেশের বেশিরভাগ নির্বাচনী এলাকায় এমপি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সরকারি দলের রাজনৈতিক -সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়ছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না তা বলা যায় না। ইতিমধ্যে সিটি নির্বাচনে এমপিদের অনেক কাজের প্রভাব পড়েছে বলে অনেকে বলছেন।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের সভাপতি হারুণ অর রশিদ হাওলাদার বলেন দীর্ঘদিন পরে হলেও এক শতাংশ অর্থ পরিষদকে দেয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ঘটনা ইতিবাচক। তিনি বলেন, হস্তান্তরিত মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের কার্যাবলীসহ অন্যান্য আইনগত বিষয় চেয়ারম্যানের কর্তৃত্বে না দেয়া হলে পরিষদকে পুরোমাত্রায় স্বাধীন বলা যাবে না। তিনি পরিষদকে এমপিদের খবরদারি মুক্ত করারও দাবি জানান। ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারী উপজেলা পরিষদের জন্য চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরিষদের আইনের ২৫ ধারায় স্থানীয় এমপিকে উপদেষ্টা হিসাবে রাখা হয়। পরিষদের কার্যাবলী সম্পাদনে এমপির ক্ষমতা পরামর্শকের। কিন্তু বাস্তবে তার ক্ষমতা নির্বাহী। এমপি যেভাবে যা বলেন, স্থানীয় উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সেভাবেই হচ্ছে। আইন অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত নথি ইউএনও’র মাধ্যমে চেয়ারম্যানের অনুমোদন নেয়ার কথা। কিন্তু কোথাও তা মানা হয় না বলে একাধিক উপজেলা চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন।