ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা-উত্সব

সোহরাব-রুস্তম

৯২তম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদ্যাপন ও প্রয়াত নাট্যকার সাঈদ আহমদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন উপলক্ষে গত ১-৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-মন্ডল-এ প্রদর্শিত হয়ে গেল যাত্রাপালা ‘সোহবার- রুস্তম’। পারস্য-প্রতিভা মহাকবি ফেরদৌসী রচিত মহাকাব্য ‘শাহনামা’ অবলম্বনে যাত্রাপালাটি রচনা করেছেন পালাকার শ্রী ব্রজেন্দ্র কুমার দে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার আঙ্গিকে এটি পরিচালনা করেছেন—ইসরাফিল শাহীন, পরিচালনা সহযোগী হিসেবে ছিলেন সুদীপ চক্রবর্তী, আশিকুর রহমান লিয়ন ও শাহমান মৈশান। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭ টায় মঞ্চস্থ হওয়া যাত্রাপালাটি পরিবেশন করেছে নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ। প্রযোজনায় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ। পালাটির শুরুতেই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রা আঙ্গিকে দেশাত্ববোধক গান পরিবেশিত হয়। ছয় নারী কুশীলব মঞ্চের দুপাশে ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে মুখ করে মোহনীয় ভঙ্গিতে ঘুরে ঘুরে—‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ গানটি পরিবেশন করে। অতঃপর শুরু হয় নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ ও অমিত চৌধুরীর প্রশিক্ষণে ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা / রূপের জাদু এনেছি/ ইরান তুরান পার হয়ে/ যেন তোমার দেশে এসেছি’—গানের সাথে কানিজ কাইয়ুম জেনির নৃত্য; ঝুমুর ঝুমুর নৃত্য! মোহাবিষ্ট দর্শকের নৃত্যের মোহ কাটতে না কাটতে শুরু হয় যাত্রাপালা সোহরাব-রুস্তম। সূচনাপর্ব ছাড়াও মোট পাঁচটি অঙ্কে বিভক্ত যাত্রাপালাটিতে উঠে এসেছে—ইরানের রাজা কায়কাউসের একান্ত অনুগত রুস্তম। মহাবীর জাল (রুস্তমের পিতা) রুস্তমকে রাজার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে রেখেছেন। রাজার আদেশ রুস্তমের অবশ্যই পালনীয়। রাজা কায়কাউসও অত্যন্ত কৌশলে ছলনায় ভুলিয়ে রুস্তমের কাছ থেকে সব কাজ আদায় করে নেন। অন্যদিকে ইরানের চিরশত্রু তুরানের রাজা আফসারিয়াব ইরান দখল করার নীল নকশা তৈরিতে লিপ্ত হন। দৃশ্যপটে এসে উপস্থিত হন এক প্রাজ্ঞ মৌলানা, যাকে যুক্তি-তর্কে পরাস্ত করেছে রুস্তমের জেষ্ঠ্য পুত্র খুরম। ইরানরাজ ক্ষোভে মৌলানাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন। মৌলানার কূট-কৌশলে তুরানরাজ আফসারিয়াব ইরান আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। এদিকে ২২ বছর আগে রুস্তমের ঔরসে সামানগাঁও-এর রাজকুমারী তাহিমনার ঘর আলো করে আসে সোহরাব। কিন্তু বিধি বাম। ২২ বছর বয়সেও সোহরাব জানে না তার পিতার পরিচয়। সোহরাব-এর কাছে তার বন্ধুরা তার পিতার পরিচয় জানতে চাইলে অজানা পিতার পরিচয় জানতে মন বড় ব্যাকুল হয়ে ওঠে সোহরাবের। অবশেষে মায়ের কাছে সে জানতে পারে, পারস্যের শ্রেষ্ঠ বীর মহাবীর রুস্তম তাঁর পিতা। পিতার সাথে সাক্ষাতের আশায় উন্মুখ হয়ে ওঠে সোহরাব। ইরানরাজ কর্তৃক বিতাড়িত মৌলানার ষড়যন্ত্রে প্ররোচিত হয়ে মাতৃত্বের বন্ধন ও প্রাণপ্রিয় নানা শাহারিয়ারকে ছেড়ে পিতার সাথে সাক্ষাতের আশায় যোগ দেয় তুরানিদের সাথে এবং ইরান আক্রমণ করে। একের পর এক দুর্গ ভেদ করে সোহরাব এগিয়ে যায়। সোহরাবের বীরত্বে ইরানরাজ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ওঠেন। তাই ডাক পড়ে রুস্তমের। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অধর্ম যুদ্ধে সম্মত হয় রুস্তম। একজন বালক বীরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে জেনে রুস্তম আশ্রয় নেয় ছদ্মবেশের। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সোহরাবের হাতে নিহত হয় রুস্তমের কনিষ্ঠ পুত্র কদম। দেশের মান রক্ষা করতে ১২ বছরের এই শিশু যুদ্ধে মুখোমুখি হয়েছিল সোহরাবের। অতঃপর ভাইয়ের কাছে ভাইয়ের পরিচয় প্রকাশ; এমনই কাহিনির বাঁকে বাঁকে অতি করুণ সুরের মূর্ছনায় বদলে যায় দৃশ্যপট। রুস্তম যুদ্ধক্ষেত্রে, তার কাছে বালক বীর সোহরাবের পরিচয় অজানা। কেননা সে এতটাই রাজভক্ত যে, ২২ বছর সামানগাঁর বিবি তাহমিনার কোনো খোঁজ নেয়নি। তাই অভিমান করে আর পুত্র হারাবার ভয়ে তাহমিনা খবর পাঠায়—রুস্তমের কন্যা হয়েছে। কিন্তু রুস্তমের কাছে এই বালককে বড় আপন বলে মনে হয়। সোহরাবেরও একই মনোভাব। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে যুদ্ধের প্রথম দিনে রুস্তম এই বালকের শক্তির পরিচয় পেয়ে কেঁপে ওঠে। বিষয়টি রাজাকে জানায়, অবশেষে রাজার আদেশে প্রথম স্ত্রীবিয়োগে ব্যাথাতুর রুস্তম আর্ত চিত্কারে উপস্থিত হয় যুদ্ধের ময়দানে। পিতা-পুত্রের পরিচয়হীন এই যুদ্ধ-গাথায় অবশেষে পিতার অন্যায় আঘাতে পুত্র সোহরাব নিহত হয়। যাত্রার শুরু থেকে বুদ হয়ে থাকা দর্শকদের অনেককেই হতাশার সাথে বলতে শোনা যায়—এমন একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প মাধ্যম আমরা আজ হারাতে বসেছি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের এমন প্রযোজনা আমাদের শুধু মুগ্ধই করেনি; আশান্বিতও করেছে। যাত্রাপালাটিতে রুস্তম চরিত্রে রূপদানকারী মো. ইলিয়াস জানান—‘সোহরাব-রুস্তম’-এ যারা অভিনয় করেছে তাদের অনেকই আগে যাত্রা দেখেনি। এমনকি তিনি নিজেও এই যাত্রা করার আগে হাতেগোনা কয়েকটা যাত্রা দেখেছেন। অথচ প্রতিষ্ঠিত যাত্রাশিল্পীদের মতোই সকলেই চরিত্রের যথেষ্ট দাবি মিটিয়েছেন। রুস্তমের দুই স্ত্রী তাহমিনা ও ফাতিমার চরিত্রে পালাক্রমে রূপদানকারী—আফরিন হুদা তোড়া ও সাইমা ফারজানা। তুরানের রাজা আফসারিয়াবের চরিত্রে কাজল, খুরম ও মৌলানার চরিত্রে অনিক ও হিমেল এবং রুস্তম চরিত্রে মো. ইলিয়াস অভিনয় করেন। সোহরাবের ভূমিকায় ছিলেন ধীমান চন্দ্র বর্মন ও ইশতিয়াক খান। উল্লেখ্য, এই যাত্রাপালার কুশীলবদের মুখ্য প্রশিক্ষক ছিলেন বিশিষ্ট যাত্রাশিল্পী মিলন কান্তি দে এবং তাঁর সহযোগী ছিলেন হাবিব সরোয়ার, রিক্তা সুলতানা ও সুলতান সেলিম।