দীর্ঘতম মানব

পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মানুষটাকে আমি চিনতাম। প্রতিবছর মাঘ-ফাল্গুনে আমাদের বাসায় কালীপুজো হতো। বাত্সরিক কালীপুজো। টানা এক মাস ধরে চলত এর জোগাড়-যন্ত্র। কাজের কোনো শেষ ছিল না। কলতলার আমগাছ থেকে ডাল কেটে এনে টুকরো টুকরো করে রোদে শুকানো, পিতলের বাসনগুলো নামিয়ে কাঁচা বরই ঘষে পরিষ্কার করা, চালের বস্তা থেকে চাল বের করে কাঁকর-চিটা বেছে ড্রামে তোলা, কুমার পাড়ায় গিয়ে মূর্তির অর্ডার দেয়া, ঝাড়-পোছে পুরো বাড়িটা শুদ্ধ করা, আর সদাইপাতি তো আছেই। তবে পুজোর আসল মজাটা শুরু হতো দিন দুয়েক আগে থেকে। স্বপন মামা তার হাতুড়ি-প্লায়ার্স নিয়ে হাজির হতো সকাল সকাল। আমরা গরম ভাতের সঙ্গে আলু চটকে খেয়ে আগে থেকেই রেডি হয়ে থাকতাম। দুই ভাই হই হই করে বাঁশ-দড়ি কিনতে যেতাম তাঁর সঙ্গে। আগেই কাগজের ফুল-নকশা কিনে রাখা হতো। স্বপন মামা ম্যাজিকের মতো বাঁশ কেটে একটা মণ্ডপের ফ্রেম বানিয়ে দিত। সারারাত সেই ফ্রেমে হাতুড়ি ঠুকে কাপড় লাগানো হতো। কাপড় লাগানোর মধ্যেও ছিল কত মুনশিয়ানা। যেন ভাঁজটা না ধরা পড়ে। ধূতি বা শাড়ির আঁচলটা যেন উঁকি না দেয়। তার দু-পাশে আমরা দুজন অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম ফুট ফরমায়েশের আশায়। মণ্ডপটার কাঠামো দাঁড়িয়ে গেলে আটা জ্বাল দিয়ে তৈরি আঁঠায় কাপড়ের ওপর লাগানো হতো ফুলের নকশা। সাদা কাপড়ের ওপর লাল-নীল নকশাগুলো জ্বলজ্বল করে উঠত। আগের দিন সন্ধ্যায় হতো অধিবাস। বিকেলে রিকশায় করে একটা শাড়িতে মূর্তি পেঁচিয়ে নিয়ে আসতাম আমরা। তারপর অনেক কায়দা-কানুন করে মণ্ডপে বসিয়ে দেওয়া হতো। এই আনা এবং বসানোর কাজটা ছিল খুব কঠিন। একটু থেকে একটু হলেই মূর্তির শরীর থেকে রঙের চাকলা উঠে যাবে, নইলে হাতে-পায়ে দেখা দেবে ফাটলের চিহ্ন। মূর্তি বসানো হলেই শুরু হতো মাতৃবোধন। ফলের মৌতাত আর ধূপের গন্ধে বইয়ে পড়া ইন্দ্রপুরিই এসে হাজির হতো আমাদের বাসায়। তার মধ্যে কালো কালীটা লাল জিহ্বা বের করে একটা ভয় ভয় ভাব এনে দিত চারদিকে। পুজোর মিষ্টি গন্ধ নাকে নিয়ে ঘুমোতে যেতাম। কিন্তু ঘুমটা পুরোপুরি শেষ হতে পারত না। সকাল হওয়ার আগেই বাবা বিছানা থেকে তুলে এনে বলির পাঁঠার মতো দাঁড় করিয়ে দিতেন কলতলায়। অন্যদিন হলে চিত্কার-চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলে নেওয়া যেত। কিন্তু আজ কালীপুজো। সব অন্যায়-অত্যাচার মুখ বুঁজে সওয়া ছাড়া উপায় নেই। স্নান সেরেই দৌড়-ঝাঁপ। সব কাজ যেন দাঁত কেলিয়ে বসে আছে আমার জন্য। কলাপাতা কাটো রে, ঘটের জন্য মাটি আনো, বেল-পাতা দূর্বা বাছো। বলার আগেই তুষ পুড়িয়ে ছাই করে রাখতে হবে। সব কিছু ঠিকঠাক না পেলে বাবার ঝাড়িতে বাসায় থাকা দায় হয়ে পড়বে। বাসায় উত্সব উত্সব ভাব। পাড়ার মা-মাসিরা বসে গেছেন বাঁটনা-কুটনায়। মুগডাল ভাজার গন্ধে চারদিক মঁ মঁ করছে। দিদিরা বসে বসে শিউলি আর গাঁদা ফুল দিয়ে একটার পর একটা মালা গাঁথছে। বড় বড় ডেচকিতে খিঁচুড়ি-লাবড়ার আয়োজন। এখানেও স্বপন মামার দাদাগিরি। একটা মানুষ কত কী করতে পারে, ভেবে অবাক হই। সন্ধ্যা ঘনালেই শুরু হতো আসল মজা। ধুপের ধোঁয়ায় চারদিকে সাদা হয়ে যেত। বাইরের পাহাড়ি কুয়াশা আর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া ধোঁয়া অমাবস্যার রাতে এক অদ্ভুত হূদ্যতায় মেতে উঠত। কখনো মনে হতো, এটা কোনো দেও-দানবের মূর্তি। কিংবা অন্য কোনো অভূতদ্রষ্টবস্তু। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠত। তখন হয়তো আমাকে আরও ভয় দেখানোর জন্য বেজে উঠত শত্রু-তাড়ানি শাঁখ, সঙ্গে দাদরা তালে কাঁসা। এমনি এক ভীতিকর পরিবেশে একটা লকঝকে সাইকেলে করে এক দীর্ঘকায় পুরুষ এসে নামতেন আমাদের কোয়ার্টারের গেটে। পরনে সফেদ ধূতি-পাঞ্জাবি। কাঁধে একটা কাপড়ের থলে। অবচেতনে হঠাত্ তাকে দেখলে ভয়ে দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার অবস্থা হয়। বাবা সন্ধ্যা থেকে চোখ মেলে থাকেন গেটের দিকে। তাই প্রথম তাঁর চোখেই আগমনটা ধরা পড়ে। দেখামাত্র ‘কত্তা মশায় এসেছেন’ বলে বাসার সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করেন। এই কত্তা মশায়ই আমাদের পুজোর পুরোহিত। আমাদের স্কুলের হেডপণ্ডিত কাম একমাত্র হিন্দু ধর্ম শিক্ষক। তারপর শুরু হতো পুজো। কালো কুচকুচে কালীমূর্তিটার সামনে ধবধবে ফরসা এক আর্য পুরুষ লালশালু গায়ে শুরু করতেন মন্ত্রপাঠ। কী এক অধরা ছন্দ, কী এক মোহিত করা মাধূর্য ছিল তাঁর কণ্ঠে। মুহূর্তে আমি হারিয়ে যেতাম কল্পনার রাজ্যে। সহস্র ঘোড়ার হ্রেস্বাধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত আমার অন্তরাত্মা। মনে হতো, হাজার বছর আগে কোনো নৃপতির দরবারে বসে অশ্বমেধ যজ্ঞ দেখছি। আমকাঠ আর ঘিয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠত যজ্ঞ। সেই হোমকুণ্ডে আমার কল্পনার দেও-দানবেরা ঘুরপাক খেত। আমকাঠ পোড়ার ফটফট একটা আওয়াজ হতো। ঘিয়ের দাপটে আগুনের শিখাগুলো আরও লকলকিয়ে উঠত। আগুনের সাথে সাথে আমাদের পণ্ডিত মশাইও যেন আরও রুদ্র, আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতেন মন্ত্রপাঠে। তাঁর ঋজু গৌর শরীরটা একসময় শুয়ে পড়ত কালীমূর্তির পায়ের কাছে। আর ভয় যেন তখন চূড়ান্ত রূপ পেত। এত ঋজু এত দীর্ঘ মানুষ আমি তখনো আর একটি দেখিনি। আজও দেখা হয়নি। আমার দেখা পৃথিবীর দীর্ঘতম মানব। এই আর্য সুপুরুষটি আমাদের স্কুলের গণ্ডীতে পা রাখলে আরেক রূপ নিতেন। বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান আর হিন্দুদের ক্লাস হতো হলরুমে; এক সাথে। তিন-চারটা ক্লাসের ছেলেরা এক হয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা-টাড্ডা মেরে সময় কাটিয়ে চলে যেত। পণ্ডিত স্যার চেয়ারে হেলান দিয়ে আপনমনে ঘুমাতেন। তার ঘুম ভাঙলেই হতো যত সমস্যা। তখন ধরে বসতেন একটা না একটা মন্ত্র। দু-চারটা মন্ত্র তাই সবসময় রিজার্ভে রাখতে হতো—হরে মুরারে মধু কৌটো ভারে...। অবশ্য এসএসসি পরীক্ষার মাসখানেক পর থেকে ধর্ম ক্লাসের মজাটাই ছিল আলদা। স্যারের চোখের ঘুম যেত টুটে। চেহারায় অনিচ্ছার আঁকিবুকি থাকত, সামনে খাতার ডাঁই। অখণ্ড মনোযোগে একটার পর একটা খাতা দেখতেন। একটা খাতা কাটা হয়ে গেলে এগিয়ে দিতেন আমাদের দিকে। আমাদের কাজ ছিল নম্বরগুলো যোগ করে মোট কত হলো, তা তাঁকে জানানো। একবার এভাবে নম্বর গুণতে গিয়ে কে যেন পেয়েছিল ১০৫! তারপর স্যার নম্বরটা ঠিক করতে করতে বললেন, ঠিকই ছিল। দ্যাখো, ছেলেটার কী সুন্দর হাতের লেখা। এ জন্য ৫ নম্বর বেশি দিলে কী আর এমন? এই হাতখোলা লোকটার হাতেই একবার ধরা খেয়ে গেলাম। ক্লাস সেভেনে এক পরীক্ষায় সংস্কৃতে বিশাল এক ডিম্ব পেয়ে বসি। পুরোপুরি ডিম্ব; মানে শূন্য। অবাক করা ব্যাপার। খারাপ হতে পারে তাই বলে শূন্য পাওয়ার তো কিছু নেই। ব্যাপারটা স্যারের নজরে আনতেই তিনি জানান, আমি সংস্কৃত পরীক্ষাই দিইনি। আমি তো অবাক। আমার সেই ক্ষুদ্র মাথা দিয়ে বারবার তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করি, আমি পরীক্ষা দিয়েছি। এই-ওই প্রশ্নের অ্যানসার করেছি। শেষমেশ পরীক্ষার অ্যাটেনডেন্স শিট আনা হলো। সেখানে স্পষ্ট আমার সই। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, খাতাটা বোধহয় হারিয়ে গেছে। কোনো চিন্তা করিস না আমি পরের পরীক্ষায় তোকে পুষিয়ে দেব। পরের পরীক্ষায় ৫০-এ ৪৫ না ৪৭ পেয়েছিলাম। মজার ব্যাপার, আমি অত অ্যানসারও করিনি সেবার। এমনই সহজ-সরল একজন মানুষ ছিলেন পণ্ডিত স্যার। কিন্তু সবাই কেন জানি তাকে তল তলে ভয় পেত। তিনি নাকি বিশাল তান্ত্রিক লোক। বাণ-টান মারতে পারেন। অনেকেই তাঁকে অমাবস্যার রাতে না কি শ্মশানের পাশে একটা মরা ছাগল নিয়ে কি যেন কি করতে দেখেছে। এটাই নাকি বাণ মারার পদ্ধতি। তাই এই সরল লোকটাকেই মাঝে মাঝে সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখে তৃপ্তি পেতাম আমরা। স্কুলের যাবতীয় বিষয়ে উদাসীন এই পণ্ডিত স্যারই হঠাত্ করে দেখা গেল ক্লাসে এসে খুব তত্পর। সংস্কৃত-ধর্ম রেখে এখন তিনি যেচে বাংলার ক্লাসে যান। সমাস-সন্ধি পড়ান। তাঁর নিদ্রা-হরা ক্লাস দেখে আমরা তো অবাক। পরে জানা গেল, হেডস্যারের সুপারিশে তিনি নাকি বোর্ডের হেড এক্সামিনার হয়েছেন। এ তো বিশাল গৌরবের ব্যাপার। এখন পণ্ডিত স্যারের সকল আগ্রহ বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে। এমনকি তিনি ধর্মের ক্লাসেও আমাদের ব্যাকরণের দুর্বল ভিত নিয়ে আফসোস করেন। পণ্ডিত স্যার তান্ত্রিক লোক। জ্যান্ত মানুষকে বাণ মেরে শেষ করে ফেলতে পারেন। আর আধমরা একটা স্কুলকে জাগাতে পারবেন না, এটা একটা কথা! তাঁর ঘুম ভাঙার সাথে সাথে আমাদের স্কুলও যেন ধড়ফড় করে উঠল। আমাদের আগের ব্যাচের মঞ্জু ভাই বোর্ড স্ট্যান্ড করে চমকে দিলেন সবাইকে। ভালো মাস্টার নাই, ডাস্টার নাই, এমন একটা স্কুলের এ রকম সাফল্যে চারদিকে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল। তাই ধুমধাম করে একটা সম্বর্ধনার আয়োজন হয়ে গেল। রেলের অফিসাররা ভাঙা জিপ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ছুটে এলেন। লাল চিঠি ছাপিয়ে গার্জিয়ানদের কল করা হলো। তাঁরাও এলেন। সুন্দর একটা সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান হলো। শুরুতেই ছাত্রদের পক্ষ থেকে স্পিচ দিলাম আমি। স্পষ্ট মনে আছে। আমার স্পিচের পর খুব হাততালি পড়েছিল। আর সবার শেষে বক্তব্য রাখলেন আমাদের হেড স্যার। স্কুলটার অবস্থা তখন খুবই নাজুক। মারাত্মক শিক্ষকসংকট। গোল্ডেন হ্যান্ডশ্যাকে পুরোনো সব শিক্ষক চলে গেছেন। দিনে একেকজন ৬-৭টা করে ক্লাস নেন। ক্লাসরুমগুলো বর্ষায় আর ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। হেডস্যার খুব ইনিয়েবিনিয়ে সেসব কথা বললেন। শেষপর্যায়ে বললেন, আমাদের হেড পণ্ডিত মশায় দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এখানে শিক্ষকতা করছেন। তিনি একজন বিএ বিএড কাব্যতীর্থ। বোর্ডে বাংলা-সংস্কৃতের হেড এক্সামিনার। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি একটাও পদোন্নতি পাননি। এখনো তিনি ভারনাকুলার টিচার হিসেবে কাজ করছেন। ভারনাকুলার টিচার শব্দটা স্যারদের কাছে তখন অনেকটা টিটকারির মতোই ছিল। সাধারণত যেসব স্যারের ডিগ্রি নেই, তাঁরা ভারনাকুলার হিসেবে নিয়োগ পেতেন। আর বেতন পেতেন অন্য টিচারদের চেয়ে তিন-চার ধাপ নিচের। হেডস্যারের কথা শুনে তো আমরা অবাক। চারদিকে পিনপতন নীরবতা। আমরা পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করি। একে-অন্যের চোখের তারায় উত্তর খুঁজে ফিরি। এমনই এক দমবন্ধ করা পরিবেশে এ দীর্ঘকায় গৌরাঙ্গ পুরুষ উঠে পড়লেন চেয়ার থেকে। নতমস্তকে নীরবে বেরিয়ে গেলেন অডিটরিয়াম থেকে। তন্ত্রমন্ত্র জানা এত উঁচু-লম্বা মানুষটাকে দূর থেকে তখন কেমন খেলনা খেলনা লাগছিল।