রোজা রাখুন সুস্থ থাকুন
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৩, ১৮:৩২
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্থ পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, কামাচার, লোভ, লালসা, অশ্লীলতাসহ দুনিয়াবি অন্যায় অপরাধ থেকে মুক্ত থেকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নিজেকে উত্সর্গ করার নাম রোজা।মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “রোজা আমার জন্য, আমি নিজে রোজার প্রতিদান দেব।” আমরা সকল ইবাদতই আল্লাহর জন্যই করি। তাহলে রোজাকে আল্লাহ কেন বললেন ‘আমার জন্য।’ আসলে অন্য সব ইবাদত করার পাশাপাশি তা প্রদর্শনের সুযোগ ও মনোভাব থাকে, যেমন নামাজ, হজ, যাকাত ইত্যাদি। কিন্তু রোজা আল্লাহ এবং বান্দা ছাড়া প্রদর্শনের বা জাহির করার কোন সুযোগই থাকে না। আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্যই আমাদের জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণের মূল নিয়ামক। এই আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম উপায় হলো রোজা। দিনে রকমারি খাবারের প্রাচুর্য্য থাকার পরও বান্দা তা মুখে তোলে না। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে গেলেও পানি পান থেকে বিরত থাকে। প্রিয়জনদের সঙ্গে ইফতার সাজিয়ে বসে থাকে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পূর্বে মুখে নেয়া হয় না। এদের উদ্দেশে হাদিসে বলা আছে- “যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স.) আনুগত্য করে, সে-ই সফলকাম”। বান্দা যেহেতু শুধু আল্লাহর হুকুম পালন এবং সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখে, তাই আল্লাহতায়ালা নিজ হাতেই তার পুরস্কার দেবেন। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদারের জন্য রয়েছে দৈহিক ও মানসিক উত্কর্ষ সাধন, আত্মিক ও নৈতিক অবস্থার উন্নতিসহ অশেষ কল্যাণ ও উপকার লাভ করার সুযোগ। রোজা মানুষকে সংযমী ও শুদ্ধ করে এবং অশ্লীল-মন্দ থেকে বিরত রাখে। আর সেজন্যই প্রত্যেক মুমিন মুসলমান, সুস্থ অথবা রোগাক্রান্ত, সবাই রোজা রাখতে চান এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চান। তবে রমজানে রোগীরা প্রায়ই রোজা রাখবেন কি রাখবেন না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। অবশ্য কি কি অবস্থায় রোজা রাখা যাবে বা যাবে না তার সুস্পষ্ট বিধান শরীয়তে আছে। আবার সুনির্দিষ্ট কারণে রোজা না রাখতে পারলে তার পরিবর্তে ক্ষতিপূরণস্বরূপ কাযা, কাফফারা, ফিদিয়া বা বদলি রোজা রাখার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তারপরও রোজা পালনে যে আনন্দ, অনুভূতি, আত্মিক পরিতৃপ্তি এরসাথে সংযম, কু-প্রবৃত্তি দমন, লোভ-লালসা, হিংসা, প্রতিহিংসা ইত্যাদি ত্যাগ করার যে আলোকোজ্জ্বল আমেজ-অনুভূতির চর্চা হয় তা রমজানের রোজা ছাড়া অন্য কোনভাবে লাভ করা যায় না। তাই রোগাক্রান্ত অবস্থায়ও অনেকেই রোজা রাখতে চান। অনেকে এমনও বলেন “মরি মরব, বাঁচি বাঁচব, তবুও রোজা ছাড়ব না।” রমজানে বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস, পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার, শ্বাসকষ্ট, হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদিতে ভুগছেন, তাদের সমস্যা হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে রোজা রাখা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও রোজা রাখতে তারা প্রবল আগ্রহী। তারা যদি চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজার মাসের জন্য ওষুধ সেবনবিধি ঠিক করে নিতে পারেন, তবে সহজেই রোজা রাখতে পারেন। এতে রোজা ভাঙ্গার বা রোজা থেকে বিরত থাকার কোন প্রয়োজন হয় না।
রুগীর জন্য রোজা :রোজা রাখার উদ্দেশ শরীরকে দুর্বল করে অকর্মন্য করা নয়, বরং শরীরকে সামান্য কিছু কষ্ট দিয়ে দৈহিক ও আত্মিক উত্কর্ষ সাধন। শুধু তাই নয়, অনেক রোগের বেলায় রোজায় ক্ষতি না হয়ে বরং বহু রোগব্যাধির প্রতিরোধক এবং আরোগ্যমূলক চিকিত্সা লাভে সহায়ক হয়। রোজায় স্বাস্থ্যের সমস্যার চেয়ে বরং স্বাস্থ্যের উপকারই বেশি হয়।
ডায়াবেটিস রোগী:রোজা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রোগীদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ ও রহমতস্বরূপ। ডায়াবেটিস রোগীরা সঠিক নিয়মে রোজা রাখলে নানা রকম উপকার পেতে পারেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল উপায় হলো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, আর রোজা রাখা হতে পারে এক অন্যতম উপায়। এতে সহজেই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ সহজ ও সুন্দরভাবে করা যায়। যারা ইনসুলিনের ওপর নির্ভরশীল নন, তাদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা হতে পারে আদর্শ চিকিত্সা ব্যবস্থা। যারা ইনসুলিন নেন তাদের ক্ষেত্রেও রোজা অবস্থায় ওষুধের মাত্রা কমাতে সহায়ক। শুধু রক্তের গ্লুকোজই নয়, রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণেও রোজা মোক্ষম। এর সঙ্গে সঙ্গে রোজা ডায়াবেটিস রোগীকে সংযম, পরিমিতিবোধ ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয় যা ডায়াবেটিসের চিকিত্সায় অপরিহার্য। রক্তের কোলেস্টেরল :যাদের শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, রোজা তাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে। রোজা ভাল কোলেস্টেরলকে (এইচডিএল) বাড়াতে এবং মন্দ কোলেস্টেরলকে (এলডিএল) ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ওজন :যাদের ওজন অতিরিক্ত, তাদের ক্ষেত্রে রোজা ওজন কমানোর জন্য এক সহজ ও সুবর্ণ সুযোগ। ওজন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন রোগ থেকে বেঁচে থাকা যায় যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, বাতের ব্যাথা, অস্টিও আরথ্রাইটিস, গাউট ইত্যাদি। আবার ওজন কমাতে পারলে কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমে আসে। হূদরোগী এবং উচ্চ রক্তচাপ :রোজার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ হওয়ার ফলে যারা হূদরোগে অথবা উচ্চ রক্তচাপে ভুগেন তাদের জন্য রোজা অত্যন্ত উপকারী। এতে শরীরের, বিশেষ করে রক্তনালীর চর্বি হ্রাস পায়, রক্তনালীর এথেরোসে্ক্লরোসিস কমাতে সাহায্য করে, যা হূদরোগের ঝুঁকি কমায় ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।