স্মরণে হুমায়ূন

হুমায়ূন স্যারের গুণের কথা করিগো বর্ণন

হুমায়ূন আহমেদের প্রায় প্রতিটি প্রোডাকশনেরই সহকারী পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন জুয়েল রানা। তাই স্বাভাবিকভাবেই হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই খানিকটা স্মৃতি তুলে ধরেছেন পাঠকদের জন্য। সাধারণত একজন মানুষের নামের আগে খুব বেশি বিশেষণ দেখা যায় না। আমাকে যদি বলা হয় স্যারের নামে আগে বিশেষণ দিয়ে স্যারের নাম লিখতে তাহলে এত এত বিশেষণ দিত পারব, যা পৃথিবীর খুব কম মানুষের নামের আগে দেখা যেতে পারে। মনে হয় যেন হুমায়ূন আহমেদ নামটাই একটা বিশেষণ। স্যার ছিলেন একাধারে একজন লেখক, কথাসাহিত্যিক, গীতিকার, কবি, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা, নাট্যকার, নাট্যনির্মাতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রশিল্পী, জাদুশিল্পীসহ আরও অনেক কিছু। স্যারের আরও অনেক গুণ ছিল যা প্রায় সবারই অজানা। জানার মধ্যে আমরা কয়েকজন জানি, বিশেষ করে নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার বুলবুল ভাই ও আমি। আরেকজন জানেন আমাদের ম্যাডাম মেহের আফরোজ শাওন। অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন জাগছে, সেই গুণগুলো কী? স্যারের অনেক বড় একটা গুণ ছিল, তিনি গাছের কথা বুঝতেন, গাছের সঙ্গে কথা বলতেন। কথাটি স্যার বলেননি, এটা আমরা বুঝে নিয়েছি। আমরা বলতে স্যারের সঙ্গে যারা ঘনিষ্ঠ হয়ে চলেছি তারা সবাই এটা এক পর্যায়ে এসে বুঝে নিয়েছি। একটা ঘটনা না বললেই নয়, আর এটা বললে অনেকের কাছেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। নুহাশ পল্লীতে একদিন শুটিং করছি। যতদূর মনে পরে নাটকের নাম ‘এনায়েত আলীর ছাগল’। নাটকটি পরিচালনা করছিলাম আমি। শুটিংয়ের সময় স্যার নুহাশ পল্লীতেই ছিলেন। নাটকের বিষয় ছিল—এক গ্রামের চেয়ারম্যানের ছাগল মানুষের মতো কথা বলতে পারে। সেই খবর গ্রামের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল গ্রামের মানুষজন দলে দলে চেয়ারম্যানের বাড়িতে আসতে শুরু করল। চেয়ারম্যানের বাড়ির কাজটি আমরা করছিলাম নুহাশ পল্লীর ভিতরে। বৃষ্টি বিলাসটিকে আমরা চেয়ারম্যানের বাড়ি বানিয়েছিলাম। স্যার দুপুর বেলা ঘর থেকে বের হয়ে দেখলেন প্রচুর লোকজনের আনাগোনা নুহাশ পল্লীর ভেতরে। স্যার আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার শুটিংয়ে এত লোকজন কেন?’ আমি হেসে দিয়ে বললাম, স্যার মোশাররফকে বলেছিলাম কিছু লোকজন খবর দিয়ে আনতে যে, ছাগল কথা বলে এর শুটিং করব, শুটিংয়ে প্রয়োজন। ও গিয়ে গত রাতে গ্রামের মধ্যে প্রচার করেছে যে, ‘নুহাশ পল্লীতে ছাগল মানুষের মতো কথা বলেছে রাতে।’ এটা শোনার পর গ্রামের মানুষ সব আসা শুরু করেছে। স্যার হেসে দিয়ে বললেন, ‘মানুষের খেয়েদেয়ে কি কোনো কাজ নেই। ছাগলের কথা শোনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আর কেউ যদি ছাগলের কথা বুঝত তাহলে না জানি কী করত।’ এটা বলেই স্যার নুহাশ পল্লীর এক কর্নারে একটা গাছের সামনে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবছিলেন। হঠাত্ স্যার নুহাশপল্লীর ম্যানেজারকে ডেকে বললেন, ‘ম্যানেজার এই গাছটা এখান থেকে উঠিয়ে ওইখানে নিয়ে লাগাও।’ এই কথা বলেই স্যার নিজের রুমে ঢুকে গেলেন। ম্যানেজার মুখ ভোঁতা করে আমার কাছে এলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার স্যারের বকা খেয়েছেন? ম্যানেজার বললেন, ‘স্যারের মাথায় কখন যে কী আসে কিছুই বুঝি না।’ আমি বললাম কী হয়েছে? তিনি বললেন, ‘ওই যে দেখলে না এতক্ষণ ধরে স্যার যেই গাছটার পাতা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি এখন বলছেন ওই গাছ ওখান থেকে তুলে অন্য একটা জায়গায় লাগাতে। এখন তুমিই বলো, এত বড় একটা গাছ, এক জায়গা থেকে তুলে অন্য কোথাও লাগালে এটা কী বাঁচবে?’ আমি বললাম, বাঁচলে বাঁচবে, না বাঁচলে নাই, স্যার যা বলেছে তাই করেন। গাছ মারা গেলে আপনি আর কী করবেন? বলেই আমি শুটিং শুরু করলাম। ম্যানেজার বুলবুল ভাই তার দলবল নিয়ে গাছ তোলার কাজে লেগে গেলেন। গাছ উঠানোর পর দেখা গেল কোটি কোটি পিঁপড়া গাছটার নিচে বাসা বেঁধেছে। গাছের নিচটা পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে। গাছের প্রায় সবকটি শিকড় কেটে ফেলেছে ওই পিঁপড়াগুলো। আর হয়তো কয়েকদিন থাকলে গাছটি মারাই যেত। তারপর স্যারকে খবর পাঠানো হলো। স্যার গাছ উঠানো হয়েছে, গাছের নিচে কোটি কোটি পিঁপড়ার বাসা। আর কয়েকদিন থাকলে গাছটা মারা যেত। স্যার সঙ্গে সঙ্গে রুম থেকে বের হয়ে গাছের কাছে এলেন এবং গাছটিকে ধরে বললেন, ‘যা বেটা, বেঁচে গেলি, আর দুইদিন গেলে তো পিঁপড়ায় তোকে খেয়েই ফেলত। এই বলেই স্যার বললেন, এই যাও তোমরা এই গাছটাকে ওইখানে নিয়ে লাগিয়ে দাও।’ তারপর স্যার পিঁপড়াগুলোকে দেখতে দেখতে বললেন, ‘এ তো দেখছি পিঁপড়ার সাম্রাজ্য।’ কয়েকটা বড় বড় পিঁপড়াকে দেখিয়ে আমাদেরকে বললেন, ‘এটা হচ্ছে পিঁপড়াদের রাজা, আর এটা হচ্ছে রানি। এটা ওদের একটা আলাদা জগত্।’ তারপর স্যার, সেগুলোকে ভিডিও করতে বলে রুমে চলে গেলেন। ঘটনার পর অনেকক্ষণ প্রায় সবাই চুপচাপ ছিলাম, বুঝে নিলাম স্যার গাছের সঙ্গে নিশ্চয়ই ভাব বিনিময় করতে পারেন। প্রায়ই তিনি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে পাতার সাথে, ডালের সাথে কথা বলতেন। এক পর্যায়ে আমরা সবাই জানতে পারি স্যার নিয়মিতই গাছের সঙ্গে কথা বলেন। যত রাতই হোক না কেন নুহাশ পল্লীতে ঢুকে তিনি রুমে প্রবেশের আগে পুরো নুহাশ পল্লীতে ঘুরে ঘুরে গাছের সাথে কথা বলে তারপর ঘরে ঢুকতেন। আজও সেই গাছ বেঁচে আছে। আরও অনেক বড় হয়েছে।