‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৩, ২৩:১১
মরিলে কান্দিস না আমার দায়।/ রে যাদু ধন মরিলে কান্দিস না আমার দায়...
আজ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তার শোক আজো লালন করছে লক্ষ পাঠকের হূদয়। এক বছর হয়ে গেল হুমায়ূন আহমেদ নেই। বিশ্বাসই হতে চায় না। গেল বছরের এই দিনে বিনা মেঘে বজ পাত হয়ে তাঁর মৃত্যুসংবাদটা এসেছিল। ১৯ জুলাই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে এগারোটার দিকে যখন খবরটা এলো তখন শোকে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো জাতি। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক অনিঃশেষ শোক- প্রাণপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের চলে যাওয়া।
তাঁর নতুন কোন সৃষ্টি আর আসবে না ভক্তদের হাতে। কিন্তু তাতেই কী হুমায়ূন হারিয়ে যাবেন— তাও কী হয়? যিনি সৃষ্টিশীলতার বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যার সৃষ্ট চরিত্র মানুষের কাছে বাস্তব হয়ে ধরা দেয়, যিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন গদ্যধারার সৃষ্টি করেছেন, যিনি লেখার ভাষা ও গানের ভাষারও স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে যিনি একজন সচেতন লেখকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন- তার জন্য এই জাতি গৌরব করবে। বাংলা পাঠক সমাজের হূদয়ে হুমায়ূন বিরাজ করবেন অনন্তকাল!
অসাধারণ প্রাণশক্তির এই মানুষটি সারাজীবন ধরে দেখিয়ে এসেছেন ইচ্ছাশক্তি থাকলে, একাগ্রতা থাকলে, ভালোবাসা থাকলে সব সম্ভব। তার সেই মন্ত্রের জোরে মানুষ এটাও বিশ্বাস করেছিল যে দুরারোগ্য ক্যান্সারকে পরাজিত করে তিনি ফিরে আসবেন তেরোশ’ নদীর দেশ — এই বাংলায়। সারাদেশের মানুষের আকুতি ছিল- ব্যাধিকে জয় করে ফিরে এসো হুমায়ূন। কিন্তু তা আর হলো না। জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে দুলে-দেশের মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
শোক জানাতে এসে হুমায়ূনের কফিনে ফুল দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন একজন ভক্ত। ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিলেন চত্বর থেকে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। কান্না জড়ানো গলায় বলে উঠলেন, ‘হুমায়ূন তুমি দেখতে পাচ্ছো। বাংলার মানুষ তোমার জন্য কাঁদছে।’ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নেমেছিল- বিমানবন্দর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঈদগাহ ময়দানের জানাজা থেকে গাজীপুরের নুহাশ পল্লী পর্যন্ত। দাফন হয়ে যাবার পর তার কবর জিয়ারতের জন্য নুহাশ পল্লীতে মানুষের ঢল আজ অবধি থামেনি।
২৪ জুলাই মঙ্গলবার চিরনিদ্রায় শায়িত হন হুমায়ূন। সেদিন শ্রাবণের অবিরাম বর্ষণ। মহান লেখকের মৃত্যুতে আকাশও কাঁদছিল যেন। কাঁদছিল নুহাশ পল্লীর প্রতিটি বৃক্ষ, ঘাস, ‘দীঘিনালা’র জল। হুমায়ূন আহমেদের শেষ বিদায়কে ঘিরে ভক্তদের চোখের জলের ধারা ধুয়ে যাচ্ছিল অঝোর বর্ষণে। শ্রাবণ ধারায় ভিজে ভিজে অন্তিম শয়ানে গেলেন বাংলার কিংবদন্তীতুল্য লেখক হুমায়ূন আহমেদ। বৃক্ষছায়া শোভিত ‘নুহাশ পল্লী’র যে লিচুতলায় বসে বিশ্রাম নিতেন, সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আবারও মানুষের ঢল নামবে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।
পরিবারের পক্ষ থেকে কোরানখানি, দোয়া মাহফিল
তার বিদায়ের প্রথম বর্ষপূর্তিতে রত্নাগর্ভা মা মিলাদ ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের ছোটভাই আহসান হাবিবের পল্লবীর বাসভবনে এর আয়োজন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আহসান হাবিব জানান, ‘আম্মা (আয়েশা ফয়েজ) নুহাশ পল্লীতে যাবেন না। তিনি দুই একদিন পরে গিয়ে একরাত থেকে আসবেন। আমাদের পক্ষ থেকে আমার বাসায় মিলাদ ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।’
অন্যদিকে, হুমায়ূন বিদায়ের এই দিনে নুহাশ পল্লীতে দোয়া ও ইফতারের আয়োজন করছেন তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। এর পাশাপাশি কোরআন পাঠ, কবর জিয়ারত ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। আজ বাদ জুমা আশপাশের কয়েকটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্ররা কোরান পাঠ করবেন। পরে তারা কবর জিয়ারত এবং ইফতার ও দোয়ায় যোগ দেবেন।
জানা গেছে, এতে অংশ নেয়ার জন্য হুমায়ূনপত্নী শাওন ইতোমধ্যেই দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিতসহ পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে নুহাশ পল্লী পৌঁচ্ছে গেছেন।
২০১১-এর সেপ্টেম্বর মাসে হুমায়ূন আহমেদের অন্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ে। ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হুমায়ূন আহমেদ চিকিত্সার জন্য নিউইয়র্ক যান। প্রথমে মেমোরিয়াল সোলান ক্যাটারিং হাসপাতালে ড. স্টিফেন আর ভিচের তত্ত্বাবধানে তিনটি কেমোথেরাপী নেন। পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানের বেলভ্যু হাসপাতালে অনকোলজি বিভাগের ডা: জেইনের তত্ত্বাবধানে চিকিত্সা করান। প্রথম পর্যায়ে ৮টি কেমোথেরাপী দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ক্যান্সারের নিরাময়ে কার্যকরী ভূমিকা নেয়ায় মোট ১২টি কেমোথেরাপী দেয়া হয়। বেলভ্যু হাসপাতালের চিকিত্সক ড. জেইন এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ক্যান্সার বিভাগের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিম গঠন করেন। সার্জিক্যাল অনকোলজি বিভাগের ডাক্তার জর্জ মিলার সমস্ত রিপোর্ট দেখে ২০১২ সালের ৭ জুন অপারেশনের মাধ্যমে হুমায়ুন আহমেদের ক্যান্সার রোগ নিরাময় হওয়া সম্ভব বলে মত দেন। ওই বছরের ১২ জুন অস্ত্রোপচারের তারিখ নির্ধারণ করেন চিকিত্সক। অপারেশনের আগে বাংলাদেশ ঘুরে আসার অনুমতি চাইলে চিকিত্সকরা লেখককে অনুমতি দেয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিনি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তার ইচ্ছা ছিল মায়ের সঙ্গে দেখা করে আর নুহাশ পল্লী ঘুরে গিয়ে অপারেশন করাবেন। চিকিত্সকরা অস্ত্রোপচারের ১০ দিন আগে লেখককে আমেরিকায় সুস্থভাবে ফিরে আসার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। অপারেশন ঠিকঠাকই হয়েছিল। কিন্তু অপারেশনের পর দেখা দেয় জটিলতা। এরপর আবারও অপারেশন করা হয়। এরপর থেকেই দেখা দেয় জটিলতা।
এক নজরে হুমায়ূন আহমেদ
জীবনযুদ্ধে নানা দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হতে হলেও লেখক হিসাবে তিনি প্রথম থেকেই বাংলার পাঠকের হূদয়ে স্থান করে নেন। নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার এ দুটি উপন্যাস দিয়ে যাত্রা শুরু তার। এরপর গত চার দশকে তার জনপ্রিয়তা আকাশ স্পর্শ করেছে। তাকে ছাপিয়ে আর কোন লেখকই আজ পর্যন্ত পাঠকের মনে স্থান করে নিতে পারেনি। লেখক হিসাবে ঈর্ষণীয় অবস্থানে বিরাজ করছেন তিনি। শুধু উপন্যাস বা ছোট গল্প নয় সংস্কৃতির যে মাধ্যমে হাত দিয়েছেন জনপ্রিয়তা যেন তার পায়ে লুটোপুটি খেয়েছে। টিভি নাটক, চলচ্চিত্র এমনকি কবিতা রচনা সবকিছুই পাঠক পরম আদরে বুকে তুলে নিয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে। তাঁর পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তাঁর পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের আরেক জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। তাদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তার তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নূহাশ আহমেদ। ১৯৯০ সালে শীলা আহমেদের বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা হয়। পরে ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি শাওনকে বিয়ে করেন। শাওনের ঘরে তার তিন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। প্রথম কন্যাটি মারা যায়। পরের দুছেলের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।
হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে।
এ পর্যন্ত অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বাংলা একাডেমী পুরস্কার, শিশু একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৩, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪), লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদক, বাকশাস পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক প্রভৃতি।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে যত কর্মসূচি
হুমায়ূন আহমেদেরে প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল নানা অনুষ্ঠানমালা প্রচারের মধ্য দিয়ে স্মরণ করবে কথার জাদুকরকে।
হুমায়ূন বিদায়ের দিনটি উপলক্ষে শনিবার বিকেলে বেঙ্গল শিল্পালয়ে শোকসভার আয়োজন করেছেন তার প্রকাশকরা। এছাড়াও তারা আজ শুক্রবার নুহাশ পল্লীতে তার কবর জিয়ারত করবেন।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নেত্রকোনায় নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। এর মধ্যে নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুল শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ, নিজ গ্রাম কুতুবপুর, মামার বাড়ি মোহনগঞ্জ ও কেন্দুয়া উপজেলা সদর ও নেত্রকোনা জেলা শহরে পৃথক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।
শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ ও কুতুবপুর গ্রামবাসীর যৌথ আয়োজনের দিনভর কর্মসূচিতে আছে সকাল ১০টায় হুমায়ূনের প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, কালো ব্যাচ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। পরে শোক র্যালী, শোকসভা , কুরআন খতম, মিলাদ, দোয়া ও ইফতার মাহফিল।
কেন্দুয়া উপজেলা সদরে হুমায়ূন স্মৃতি সংসদের সম্পাদক রহমান জীবন জানান, তারা সকাল ১১টায় করবে শোক র্যালী। এ ছাড়াও তাদের আয়োজনে রয়েছে শোকসভা।
এছাড়াও, হুমায়ূন আহমেদের মামার বাড়ি জেলার মোহনপঞ্জ উপজেলা সদরের চয়নিকা পাঠাগারের সভাপতি তাহমিনা সাত্তার জানান, বিকাল ৪টায় উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা, মিলাদ ও ইফতারের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নানা আয়োজনে পালন করা হবে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রবাসী শিশুদের হাতে তার প্রতিকৃতি অঙ্কন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হবে। নিউইয়র্কের মুক্তধারা ফাউন্ডেশন জ্যাকসন হাইটসে আয়োজন করছে। এছাড়া হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে শোকসভা, তার লেখা পাঠ, কবিতা আবৃত্তি, তথ্যচিত্র প্রদর্শন ও তার শেষ দিনগুলোর বর্ণনায় সাজানো হয়েছে অনুষ্ঠানমালা। এছাড়াও একই দিন জ্যামাইকায় হুমায়ূন আহমেদ মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন স্মরণ সভা, দোয়া মাহফিল ও ইফতারির আয়োজন করেছে।