শিল্পে গ্যাস সংকট আগে ছিল না, এখন হচ্ছে
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৩, ২৩:১২
১৯৮৪ থেকে ২০০৮ এর মধ্যে কখনো গ্যাসের অভাবে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়নি। বর্তমানে গ্যাসের উত্তোলন বাড়লেও সংকট অনেক বেড়েছে। শিল্প-কারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে যথাযথ উত্পাদন করতে পারছে না। বছরের বেশি সময় শিল্প-কারখানা গ্যাসের ভোগান্তি নিয়ে চলছে। দিন দিন বাড়ছে গ্যাস সংকট। অগ্রাধিকার ঠিক করে গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি।
গত কয়েক বছরে গ্যাসের উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। যা অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে সে বাড়তি উত্পাদনের সুফল যথাযথ ভোক্তারা পায়নি।
অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা আর দুর্নীতির কারণে গ্যাসের সংকট কাটেনি। গেল কয়েক বছর এই সংকট তীব্র হয়েছে। গত দশ বছরে গ্যাসের উত্তোলন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু ভোগান্তি যা ছিল তাই আছে। বিশেষ করে শিল্প-কারখানার ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে।
ব্যবস্থাপনার অভাবে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ দেয়ার কথা বলা হলেও তা ঠিকমত দেয়া যায়নি। শিল্প উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আগে আপত্তি শোনা যায়নি। মাঝে মাঝে সংকট হয়েছে তা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। পর্যায়ক্রমে এই সংকট বেড়েছে। আর গত কয়েক বছর ছিল শিল্পে তীব্র সংকটের বছর। এই সময় শিল্প উদ্যোক্তাদের গ্যাস পাওয়া নিয়ে অভিযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। ব্যবস্থাপনা আর নীতির অভাবে এই পরিস্থিতি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা আর অগ্রাধিকার ঠিক করে গ্যাস সরবরাহ করলে পরিস্থিতি এমন হত না। তা না করে বরং দুর্নীতি আর অবৈধ ব্যবস্থাকে আরো উস্কে দেয়া হয়েছে। গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়লেও তার সুফল এসব কারণে সরকার নিতে পারেনি।
গত কয়েক বছর প্রায় পুরো সময়টা জুড়ে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ ছিল। কিন্তু গ্যাসের চাহিদা বাড়তে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী নতুন সংযোগ না দিলেও চাহিদা বেড়েছে। যার পুরোটাই হয়েছে অবৈধভাবে। আর অবৈধভাবে এই চাহিদা বাড়ার ফলে গ্যাসের ব্যবহারে অগ্রাধিকার ঠিক করা যায়নি। অন্যদিকে গ্যাস আছে কি নেই তা বিচার না করেই এবং যথাযথ স্থান ঠিক না করে বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতার অভাব। সমন্বিতভাবে এই কাজ করতে পারলে সমস্যা অনেক কম হত। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে যার জন্য পেট্রোবাংলার কাছ থেকে গ্যাসের কোন অনুমতি নেয়া হয়নি।
গত কয়েক বছরে ৩০২টি বড় প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ২২১টি শিল্প-কারখানা। সিএনজি স্টেশন দুইটি আর ক্যাপটিভ বিদ্যুত্ কেন্দ্র আছে ৫৯টি। এছাড়া আবাসিক বাড়িতে অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে এক লাখ ৬৪ হাজার ৮০৩টিতে।
অথচ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সচল রাখতে অনুত্পাদনশীল খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর জন্য নতুন সংযোগ বন্ধ ছিল। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বরং দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস নিতে হয়েছে।
২০০৪ সালে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ছিল এক হাজার ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু উত্তোলন হয়েছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি ছিল। ২০০৭ সালে গ্যাসের চাহিদা ধরা হয়েছিল এক হাজার ৫৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর উত্তোলন করা হয়েছে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ৬ বছরে গ্যাসের উত্তোলন এবং সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা দুই হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। উত্তোলন করা হচ্ছে দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
বলা হচ্ছে, শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে গ্যাস দেয়া হবে। কিন্তু কোন সংকট তৈরি হলে সবার আগেই শিল্প- কারখানায় রেশনিং করে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়। একদিকে শিল্পকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে অনুত্পাদনশীল খাতে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে।