আমেরিকার সমৃদ্ধির শুরুতে তিন অভিবাসীর অবদান

১৬০৭ সালে সেই যে উপনিবিষ্ট হওয়ার শুরু, তারপর থেকে কমপক্ষে ৭০ মিলিয়ন অভিবাসী প্রবেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এ যেন এক অসমাপ্ত প্রক্রিয়া; চলছে তো চলছেই এবং ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তাদের শ্রম যে আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখেছে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের অবিস্মরণীয় উদ্ভাবন আমেরিকার সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বারাক ওবামা ও মিট রমনি উদ্যোগ, উদ্ভাবন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও চাকরি সৃষ্টির ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন প্রতিদ্বন্দ্বীই অভিবাসন আইনের সর্বাত্মক সংস্কারের বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি, যা আরো আগেই দেয়া উচিত ছিল। অনেক আমেরিকানই এ বিষয়টিকে অস্বীকার করেন, আবার কেউবা এ বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে চান কৌশলে। তাদেরকে বোকা বলাই উচিত, যারা অবিভাসীদের উদ্ভাবনকে অবজ্ঞা করে বলতে চায় তাদের অবদান তুচ্ছ এবং ভবিষ্যতে আমেরিকার সমৃদ্ধিতে কোন কাজেই আসবে না। দেশের ইতিহাস সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই তাদের অথবা জেনেও না জানার ভান করে। তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়তো কোনদিনই হবে না। দেশের সূচনায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার তিনজন মূল স্থপতিই ছিলেন অভিবাসী। এই তিনজন হলেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটন (তিনি এসেছিলেন তত্কালীন ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের অংশ সেন্ট ক্রোইক্স থেকে) এবং যথাক্রমে ইংল্যান্ড ও জেনেভায় জন্ম নেয়া রবার্ট মরিস ও আলবার্ট গ্যালাটিন। আমেরিকার স্বাধীনতার সময় শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের সংখ্যাটা পাঁচ শতাংশের বেশি ছিল না। অথচ আর্থিক নীতি তৈরির ব্যাপারে এই তিনজনের অবদানই ছিল অবিস্মরণীয়। আমেরিকায় বিপ্লবী যুদ্ধের সময় মরিস ছিলেন অর্থ ব্যবস্থাপনার অধীক্ষক। মহাদেশীয় বাহিনীকে অর্থ দেয়ার ব্যাপারে তিনি পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রাজকোষের প্রথম সচিব হিসেবে হ্যামিলটন দেশকে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে এর আর্থিক পদ্ধতির নকশা এঁকেছিলেন। আর গ্যালাটিন জাতীয় ঋণের অধিকাংশ প্রদানের পাশাপাশি লুসিয়ানা ক্রয়ের ব্যাপারে অর্থ সংস্থানের জন্য কলকাঠি নেড়েছিলেন। আমেরিকার ইতিহাসে তিনিই সবচে’ দীর্ঘমেয়াদি রাজকোষ সচিব। অভিবাসীদের আর্থিক উদ্ভাবন চলমান ছিল ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত। ১৮০৮ সালে আয়ারল্যান্ড থেকে আসা আলেকজান্ডার ব্রাউন স্থাপন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বিনিয়োগ ব্যাংক। তার অভিবাসী পুত্র অনেক সংগ্রামের পর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রাউন ব্রাদার্স। জার্মানীর লেহম্যান ব্রাদার্সের শুরুটা ছিল আলাবামাতে শুকনো সামগ্রী ব্যবসায়ী ও তুলার ব্রোকার হিসেবে। গৃহযুদ্ধের ঠিক আগে নিউইয়র্কে গিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন একটি ব্যাংক। প্রথমে ফ্রান্সের ল্যাজার্ড ব্রাদার্সের ব্যবসাও ছিল শুকনো ফলের। পরবর্তীতে বনে যান সফল স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং তারও পরে নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠা করেন ল্যাজার্ড ফেরেসের সদর দপ্তর। এটিই এখন বিশ্বব্যাপী পরিচিত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। গোল্ডম্যন সাকেসর মার্কাস গোল্ডম্যানসহ আরো অনেক অভিবাসীর শুরুটা ছিল খুব ছোট পরিসরে। গৃহযুদ্ধের পরেও অনেক অভিবাসী উদ্ভাবক নানা শিল্পের সূচনা করেছিলেন। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে এন্ড্রু কারনেগি (স্কটল্যান্ড, স্টিল), জোসেফ পুলিতজার (হাঙ্গেরি, সংবাদপত্র) ও ডেভিড সারনফ (রাশিয়া, ইলেকট্রনিক্স)। এদের প্রত্যেকেই ভাগ্যান্বেষণে আমেরিকা এসেছিলেন তরুণ বয়সে; এরা দরিদ্র হলেও ছিলেন প্রবল কর্মশক্তিসম্পন্ন। কারনেগির মা পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ১৮৪৮ সালে। এন্ড্রুর বয়স তখন মাত্র ১২। এই কচি বয়সেই তাকে নেমে পড়তে হয়েছিল কঠিন জীবনযুদ্ধে। ক্রমান্বয়ে তিনি ছিলেন টেক্সটাইল মিলের ববিনবয়, টেলিগ্রাম মেসেঞ্জার, টেলিগ্রাফ-কি অপারেটর, পেনসিলভেনিয়া রেলরোডের নিম্ন বেতনভুক্ত ম্যানেজার এবং পরবর্তীতে একই রেলরোডের বন্ড বিক্রেতা। এরপর তাকে পেয়ে বসে স্টিলের নেশায়; প্রতিষ্ঠা করেন নতুন স্টিল কোম্পানি। তিনি সস্তায় উত্পাদন করা শুরু করেন বহুতল ভবনের জন্য স্ট্রাকচারাল স্টিল এবং অটোমোবাইলের জন্য শিট স্টিল। পুলিতজার ছিলেন গৃহশিক্ষায় শিক্ষিত বিত্তশালী হাঙ্গেরিয়ান পরিবারের সন্তান। হঠাত্ করে অর্থবিত্ত খুইয়ে তারা আমেরিকায় চলে আসতে বাধ্য হন ১৮৬৪ সালে। পুলিতজার তখন ১৭ বছরের টগবগে যুবক; যোগ দিয়েছিলেন ম্যাসাচুসেটস সিভিল আর্মি রেজিমেন্টে। যুদ্ধ শেষে তিনি ছিলেন কপর্দকশূন্য। রুটি-রুজির অন্য কোন উপায় না দেখে তিনি মিশে পড়েন সেন্ট লুইস নামক জার্মান অভিবাসীদের একটি কেন্দ্রে। এক পর্যায়ে তিনি তাদের ভাষা বলতে পারতেন অনর্গলভাবে। ওয়েটার, রেলরোডের কেরানী ও আইন চর্চা করার পর পুলিতজার একটি জার্মান স্থানীয় সংবাদপত্রে যোগ দেন রিপোর্টার হিসেবে এবং ঘটনাচক্রে খুব শীঘ্রই তিনি সেটির আংশিক কিনে নিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে দুটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ক্রয় করলেও এক পর্যায়ে সে দুটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে নতুন পত্রিকা বের করেন; নাম দেন সেন্ট লুইস পোস্ট-ডিসপাচ। ১৮৮৩ সালে নিউইয়র্কে গিয়ে কিনে ফেলেন দ্য নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড। সেখানে তিনি অন্য পত্রিকাগুলোর সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হন, বিশেষত দ্য সান-এর সঙ্গে। কিন্তু পুলিতজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড শ্রমিক ও অভিবাসীদের পক্ষে থাকায় জনপ্রিয়তা পেয়ে গিয়েছিল অতি দ্রুত। ১৯০১ সালে ৯ বছর বয়সে সারনফ রিক্তহস্তে রাশিয়া থেকে এসেছিলেন আমেরিকায়। প্রথমে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন রাস্তায় ইহুদি ভাষার পত্রিকা বিক্রি করে। এরপর কাজ করেন যথাক্রমে অফিসের কেরানী, টেলিগ্রাম মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে। আরো পরে তিনি যোগ দেন অনভিজ্ঞ রেডিও প্রতিষ্ঠান আর সি এ-তে। খুব দ্রুতই এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বনে গিয়েছিলেন তিনি। তখন পর্যন্ত রেডিও প্রযুক্তি সৌখিন বিষয়। এর ব্যবহার ছিল মূলত সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে, তবে বড়লোকদের কেউ কেউ ব্যবহার করতেন। এটিকে সর্বস্তরের মানুষের জন্য বিনোদনের উপকরণ হিসেবে কাজে লাগানোর চিন্তা মাথায় আসে সারনফের। তাতে তিনি সফলও হন। এক পর্যায়ে আর সি এ শুরু করে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী উত্পাদন। কার্যত যুক্তরাষ্ট্রে অনেক দিন পর্যন্ত ইলেকট্রনিক্স ও আর সি এ ছিল সমার্থক। এই তিনজনের অবদান বিশাল। তাদের তুলনায় কম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধিতে অবদান রেখেছেন আরো লক্ষ লক্ষ অভিবাসী এবং রেখে যাচ্ছেন। আমেরিকার চলচ্চিত্র ও তথ্য প্রযুক্তিকে সমৃদ্ধ করেছেন বিংশ শতাব্দীর অভিবাসীরা। এতে চলে আসে হলিউড স্টুডিও এমজিএম, ওয়ার্নার ব্রাদার্স, ইউনাইটেড আর্টিস্টস, প্যারামাউন্ট ও ইউনিভার্সাল; সিলিকন ভ্যালি কোম্পানি ইন্টেল, ইবে, গুগল, সান মাইক্রোসিস্টেমস এবং হটমেইলের নাম। আমেরিকার নতুন অর্থনৈতিক নীতি উদ্ভাবনে আরেক বিখ্যাত অভিবাসীর নাম হচ্ছে জোসেফ শুমপিটার। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার কারণে অভিবাসীরা দেশজ আমেরিকানদের কাছ থেকে সব সময়ই প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে এবং এটাই স্বাভাবিক। গতিশীলতার কারণে অভিবাসীরা বেশি উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হয় । এর পেছনে অনেক কারণের পাশাপাশি মানসিক কারণও রয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমেরিকায় শত একাডেমিক মনোগ্রাফেও বিষয়টি প্রমাণ করা যায়নি। যেটি বের হয়েছে সেটি হলো- স্বদেশিরা অজানা কারণে কম ঝুঁকি নিতে চায় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাদের অনুত্সাহ কাজ করে। সব কিছুর পরেও একটি কথা সত্য যে, যুক্তরাষ্ট্রকে আজকের যুক্তরাষ্ট্র বানানোর পেছনে অভিবাসীদের অবদানই বেশি। আজ অভিবাসনের অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় পড়ে অনেকেই নাগরিকত্ব পাচ্ছে না। লুকোচুরি করে দিন কাটাচ্ছে তারা । কেউ স্বীকার করুক আর না-ই করুক, এতে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি। তাদের প্রতিভাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না যথাযথভাবে। কাজেই অভিবাসন আইনের আমূল সংস্কার প্রয়োজন। যত দ্রুত করা যাবে ততই মঙ্গল। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকার মনে হয় বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। সেজন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে অভিবাসন আইন সংস্কারের। — ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে