রোজা রাখলে রোগ ও স্বাস্থ্যের উপকার

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “রোজা আমার জন্য, আমি নিজে রোজার প্রতিদান দেব।” সব ইবাদতই তো আল্লাহর জন্যই। তাহলে রোজাকে আল্লাহ কেন বললেন ‘আমার জন্য।’ আসলে সব ইবাদত করার পাশাপাশি তা প্রদর্শনের সুযোগ ও মনোভাব থাকে, যেমন নামাজ, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি। কিন্তু রোজা আল্লাহ এবং বান্দা ছাড়া প্রদর্শনের বা জাহির করার কোন সুযোগই থাকে না। আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্যই আমাদের জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণের মূল নিয়ামক। এই আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম উপায় হলো রোজা রাখা। দিনে রকমারি খাবারের প্রাচুয্য থাকার পরও বান্দা তা মুখে তোলে না। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে গেলেও পানি পান থেকে বিরত থাকে। প্রিয়জনের সাথে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসে থাকে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে খাওয়া হয় না। এদের উদ্দেশ্যে হাদিসে বলা আছে-“যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স:)এর আনুগত্য করে, সেই সফলকাম।” বান্দা যেহেতু শুধু আল্লাহর হুকুম পালন এবং সন্তষ্টির জন্য রোজা রাখে, তাই আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতেই তার পুরষ্কার দিবেন। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদারের জন্য রয়েছে দৈহিক ও মানসিক উত্কর্স সাধন, আত্মিক ও নৈতিক অবস্থার উন্নতিসহ অশেষ কল্যাণ ও উপকার লাভ করার সুযোগ। রোজা মানুষকে সংযমী ও শুদ্ধ করে এবং অশ্লীল-মন্দ থেকে বিরত রাখে। আর সেজন্যই প্রত্যেক মুমিন মুসলমান, সুস্থ অথবা রোগাক্রান্ত, সবাই রোজা রাখতে চান এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চান। তবে রমজানে রোগীরা প্রায়ই রোজা রাখবেন কি রাখবেন না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভোগেন। অবশ্য কি কি অবস্থায় রোজা রাখা যাবে বা যাবে না তার সুস্পষ্ট বিধান শরীয়তে আছে। আবার সুনির্দিষ্ট কারণে রোজা না রাখতে পারলে তার পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ কাযা, কাফফারা, ফিদিয়া বা বদলী রোজা রাখার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তারপরও রোজা পালনে যে আনন্দ, অনুভূতি, আত্মিক পরিতৃপ্তি এর সাথে সংযম, কুপ্রবৃত্তি দমন, লোভ-লালসা, হিংসা, প্রতিহিংসা ইত্যাদি ত্যাগ করার যে আলোকোজ্জল আমেজ-অনুভূতির চর্চা হয় তা রমজানের রোজা ছাড়া অন্য কোনভাবে লাভ করা যায় না। তাই রোগাক্রান্ত অবস্থাও অনেকেই রোজা রাখতে চান। অনেকে এমনও বলেন, “মরি মরব, বাঁচি বাঁচব, তবুও রোজা ছাড়ব না।” রমজানে বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস, পেপটিক আলসার বা গ্যাস্টিক আলসার, শ্বাসকষ্ট, হার্টের রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদিতে ভূগছেন, তাদের সমস্যা হবার সম্ভাবনা থাকে। তবে রোজা রাখা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে থাকলেও রোজা রাখতে তারা প্রবল আগ্রহী। তারা যদি চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজার মাসের জন্য ওষুধ সেবন বিধি ঠিক করে নিতে পারেন, তবে সহজেই রোজা রাখতে পারেন। এতে রোজা ভাঙ্গার বা রোজা থেকে বিরত থাকার কোন প্রয়োজন হয় না। রোজা, রোগ ও আপনার স্বাস্থ্য রোজা রাখার উদ্দেশ্য শরীরকে দুর্বল করে অর্কমন্য করা নয়, বরং শরীরকে সামান্য কিছু কষ্ট দিয়ে দৈহিক ও আত্মীক উত্কর্ষ সাধন। শুধু তাই নয়, অনেক রোগের বেলায় রোজার ক্ষতি না হয়ে বরং বহু রোগব্যাধির প্রতিরোধক এবং আরোগ্যমূলক চিকিত্সা লাভে সহায়ক হয়। রোজায় স্বাস্থ্যের সমস্যার চেয়ে বরং স্বাস্থ্যের উপকারই বেশি হয়। ডায়াবেটিক রোগী রোজা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের কেষত্রে রোগীদের জন্য এক সুবর্ন ও রহমত স্বরুপ। ডায়াবেটিক রোগরাি সঠিক নিয়মে রোজা রাখলে নানা রকম উপকার পেতে পারেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল উপায় হল খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, আর রোজা রাখা হতে পারে এক অন্যতম উপায়। এতে সহজেই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ সহজ ও সুন্দরভাবে করা যায়। যারা ইনসুলিনের উপর নির্ভরশীল নন, তাদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা হতে পারে আদর্শ চিকিত্সা ব্যবস্থা। যারা ইনসুলিন নেন তাদের ক্ষেত্রেও রোজা অবস্থায় ওষুধের মাত্রা কমাতে সহায়ক। শুধু রক্তের গ্লুকোজই নয়, রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণেও রোজা মোক্ষম ভূমিকা পালন করে। এর সাথে সাথে রোজা ডায়াবেটিক রোগীকে সংযম, পরিমিতিবোধ ও সৃঙ্খলার শিক্ষা দেয় যা ডায়াবেটিসের চিকিত্সায় অপরিহার্য। রক্তের কোলেস্টেরল যাদের শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, রোজা তাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়ক করে। রোজা ভালো কোলেস্টেরলকে (এইচডিএল) বাড়াতে এবং মন্দ কোলেস্টেরল (এলডিএল) ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ওজন যাদের ওজন অতিরিক্ত, তাদের ক্ষেত্রে রোজা ওজন কমানোর জন্য এক সহজ ও সুবর্ন সুযোগ। ওজন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন রোগ থেকে বেঁচে থাকা যায় যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগসহ শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ, বাতের ব্যথা, অস্টিও আরথ্রাইটিস, গাউট ইত্যাদি। আবার ওজন কমাতে পারলে কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমে আসে। হূদরোগী এবং উচ্চ রক্তচাপ রোজার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ হওয়ার ফলে যারা হূদরোগে অথবা উচ্চ রক্তচাপে ভুগেন তাদের জন্য রোজা অত্যন্ত উপকারী। এতে শরীরের, বিশেষ করে রক্তনালীর চর্বি হ্রাস পায়, রক্তনালীর এথোরোস্ক্লেরোসিস কমাতে সাহায্য করে, যা হূদরোগের ঝুঁকি কমায় ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পেপটিক আলসার এক সময় ধারণা ছিল পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন না, তাদের ঘনঘন খাওয়া খেতে হবে, অনেকক্ষন পেট খালি রাখা যাবে না। অনেকে মনে করেন রোজা পেপটিক আলসারের ক্ষতি করে এবং এসিডের মাত্রা বাড়ায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব ধারণা ঠিক নয়। রোজায় নিয়ন্ত্রিত খাওয়া দাওয়ার ফলে এসিডের মাত্রা কমে যায়। তাই সঠিকভাবে রোজা রাখলে এবং সঠিক খাবার দিয়ে সেহেরী ও ইফতার করলে রোজা বরং আলসারের উপশম করে, অনেক সময় আলসার ভাল হয়ে যায়। এছাড়া রোজা গ্যাস্ট্রিইটিস, আইবিএস ইত্যাদি রোগেও উপকারী। শ্বাসকষ্ট ও এজমা রোগী যারা এই সমস্ত রোগে ভোগেন, তাদেরও রোজা রাখতে কোন অসুবিধা নেই। রোজায় এ ধরণের রোগ সাধারণত: বৃদ্ধি পায় না। বরং চিন্তামুক্ত থাকায় এবং আল্লাহর প্রতি সরাসরি আত্মসর্মপনের ফলে এ রাগের প্রকোপ কমই থাকে। প্রয়োজনে রাতে একবার বা দুইবার ওষুধ খেয়ে নিবেন যা দীর্ঘক্ষণ শ্বাস নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ ধরণের ওষুধ বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। দিনের বেলায় প্রয়োজন পরলে ইনহেলার জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যায়, যা রোজার কোন ক্ষতি করবে না। উপসংহারে বলা যায়, রোজা যেহেতু আল্লাহ তায়ালার জন্য এবং আল্লাহ এর পুরষ্কার দিবেন, তাই কেউ যদি মনে করেন আমি আল্লাহর জন্যই রোজা রাখব, যা হবার হবে, তার কোন সমস্যই হবে না। আর যারা মনে করবে রোজা রাখলে নানা রকমের সমস্যা হবে, রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে, নানা রকম জটিলতা হবে, তাদের বেলায় এসব সমস্যা হবার সম্ভাবনাই বেশি। দৈহিক রোজার সাথে সাথে অন্তরের রোজাটাই আসল। তাই কোন অজুহাত বা আলস্য করে রোজা পালন থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। লেখক:ডীন, মেডিসিন অনুষদ অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়