ভিটামিন এ এবং ই এর উত্স এবং উপকারিতা
ডঃ শাহ্ মোহাম্মদ কেরামত আলী ডীন, ফ্যাকাল্টী অফ এলাইড হেলথ সায়েন্স ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটি
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪৫
ভিটামিন একটি প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান। ইহা একটি জৈব রাসায়নিক পদার্থ এবং মানব দেহে তা অল্প পরিমাণে দরকার। ভিটামিন প্রাণীদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। বিভিন্ন ভিটামিনের মধ্যে স্নেহ পদার্থে দ্রবীভূত ভিটামিনগুলো হলো এ, ডি, ই, এবং কে। আমরা এখানে ভিটামিন এ ও ই নিয়ে আলোচনা করব। ভিটামিন ‘এ’ চোখের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এছাড়া ভিটামিন এ দেহের বৃদ্ধি ও বাহ্যিক আবরণের কোষ, চর্ম, দাঁত ও অস্থির গঠন এবং নানা রকম সংক্রামক রোগ হতে শরীরকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয়। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে শরীরে প্রাপ্ত লৌহের স্বাভাবিক ব্যবহারে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে রক্ত স্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
একজন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ অথবা
মহিলার জন্য ৭৫০ মাইক্রোগ্রাম রেটিনল অথবা ২৫০০ আন্তর্জাতিক একক (আই.ইউ) ভিটামিন ‘এ’ দরকার, যেখানে আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে ও শহরাঞ্চলের একজন পূর্ণ বয়স্ক লোকের ভিটামিন এ গ্রহণের পরিমাণ যথাক্রমে ১৫৮০ ও ১৭১৫ আর্ন্তজাতিক একক। পূর্ণবয়স্কের খাদ্যে ভিটামিন ‘এ’ নিম্নসীমা দৈনিক অন্তত ৭০০ (মহিলা) ও ৯০০ (পুরুষ) মাইক্রোগ্রাম এবং পূর্ণবয়স্কের খাদ্যে উর্দ্ধসীমা; দৈনিক সর্বাধিক ৩০০০ (মহিলা ও পুরুষ মাইক্রোগ্রাম।
ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে মানবদেহে রোগ দেখা দেয় প্রকট ভাবে, বিশেষকরে ৯ মাস থেকে ৪ বত্সরের বাচ্চাদের মধ্যে। ছেলেরাই মেয়েদের থেকে বেশী করে এরোগের আক্রান্ত হয়। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব জনিত রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে রাতকানা হয়ে যাওয়া। এছাড়া ভিটামিন এ-এর অভাবে ঘা হয় এবং অস্থি-ঝিল্লির প্রদাহ ও ক্যারাটোম্যালেশিয়া রোগও হতে পারে। বাংলাদেশের শতকরা ২ দশমিক ৭ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা ও ২ দশমিক ৪ শতাংশ দুগ্ধ দান কারী মহিলাদের রাতকানা রোগ হয়ে থাকে। ভোজ্য তেলগুলোর মধ্যে পাম তেল হচ্ছে বিটা-ক্যারোটিনের সমৃদ্ধতম প্রাকৃতিক উত্স। অপরিশোধিত পামতেলে ভিটামিন ‘এ’ গাজরের চেয়ে ১৫ গুণ এবং টমেটোর চেয়ে ৩০০ গুণ বেশী থাকে।
উদ্ভিজ্জ উত্স হতে প্রাপ্ত ক্যারোটিনয়েডস থেকে প্রাপ্ত প্রাক ভিটামিন এ থেকে রেটিনল পেতে হলে এই সব শাক সবজি ও তেল ব্যবহার করতে হবে। যেমন- কাঁচা সবুজপাতা সমন্বিত সবজি, কাঁচা অথবা হলুদ অথবা কমলা রঙ্গের সবজি, টাটকা সবজির রস, অল্প রান্না করা হলুদ, কমলা বা সবুজ রঙ্গের সবজি অথবা সবজির রস, হলুদ অথবা কমলা রঙ্গে কন্দ, হলুদ অথবা সবুজ রঙ্গের ফল, লাল পাম তেল, কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত ক্যারোটিনয়েড।
ভিটামিন ই মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিটামিন। মূলত এর কাজ এন্টি অক্সিডেন্ট হিসাবে দেহের জন্য ক্ষতিকর ফ্রী রেডিকেল ধ্বংস করা। এছাড়া দেহের গঠনে এবং রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন ‘ই’ এর ভূমিকা রয়েছে। উদ্ভ্ভিদজাত তেল বিশেষ করে গমের কুঁড়ার তেল, পাম তেল, সয়াবীন তেল, চালের কুঁড়ার তেল, সূর্যমুখীর তেল ইত্যাদিতে এবং বাদাম, সবুজ সবজি, পালংশাক, ডিমের কুসুম এবং সয়াবীনে ভিটামিন ই বেশী পাওয়া যায়। মানব দেহে সাধারণত: ভিটামিন ‘ই’ এর ঘাটতি হয় না। তবুও কোন কারণে ভিটামিন ‘ই’ এর ঘাটতি হলে নানারকম স্নায়বিক রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।
ভিটামিন ই-এর বহুবিধ গুণাবলীর কারণে ইদানিং ডাক্তারগণ প্রায় বিশেষভাবে ৪০-এর বেশী বয়স্কদের নিয়মিতভাবে ভিটামিন ‘ই’ সেবনের পরামর্শ দিচ্ছেন। ডাক্তারগণের পরামর্শ অনুযায়ী আমরাও বাজারে প্রাপ্ত বিভিন্ন নামের ভিটামিন ‘ই’ সেবন করছি। কিন্তু আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে বাজারে প্রাপ্ত ভিটামিন ‘ই’ ক্যাপসুলগুলো অধিকাংশই কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত ভিটামিন ই দ্বারা তৈরী। অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে কৃত্রিম উপায়ে তৈরী ভিটামিন ‘ই’ অপেক্ষা প্রাকৃতিকভাবে খাদ্যের মাধ্যমে
প্রাপ্ত ভিটামিন ‘ই’ অধিক
উপকারী। নিয়মিতভাবে ভিটামিন ‘ই’ ক্যাপসুল সেবন করলে হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার
আশংকা হ্রাস পাবে। বর্ণিত সমীক্ষায় দেখা গেছে ভিটামিন ‘ই’ তখনই অধিক কার্যকরী যখন তা খাদ্য হতে প্রাপ্ত হয়। এখন দেখা যাক , কোন কোন খাদ্য হতে ভিটামিন ‘ই’ পাওয়া সম্ভব।
খাদ্যদ্রব্যের জানা উত্সগুলোর মধ্যে ভোজ্য তেল অথবা চর্বি ভিটামিন ‘ই’ এর অন্যতম প্রধান উত্স। ভিটামিন ‘ই’ আবার দু’ধরণের-টোকোফেরল ও টোকোট্রায়েনল। গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে টোকোফেরল অপেক্ষা
টোকোট্রায়েনল মানবদেহে অধিক কার্যকরী। বিভিন্ন খাদ্য বস্তুতে ভিটামিন ‘ই’ এর পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামে আছে, গমের ভ্রুণের তেলেল-২৫৫ মি.গ্রাম, সয়াবীন তেলে ১১৮ মি.গ্রাম, ভূট্টার তেলে ৯১ মি.গ্রাম, চালের কুঁড়ার তেলে ৯১ মি.গ্রাম, পাম তেলে ১০০ মি.গ্রাম, সূর্যমুখীর বিচির তেলে ৭০ মি. গ্রাম, জলপাই তেলে ৩০ মি.গ্রাম, বাদাম তেলে ২২ মি.গ্রাম, নারকেল তেলে ৮ মি.গ্রাম।
টোকোট্রায়েনল নামক ভিটামিন ‘ই’ পাম তেলে বেশী পাওয়া যায়।
রাইসব্রান (চাউল এর কুঁড়া হতে সংগৃহীত) তেল ছাড়া আর কোন সাধারণ ভোজ্য তেলে টোকোট্রায়েনল নামক ভিটামিন ‘ই’ এর কম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নেই। টোকোট্রায়েনল ভিটামিন ‘ই’ কোলেস্টেরল কমাতে ও ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। সম্প্রতি পরিচালিত রীডিংস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় একই ফলাফল পাওয়া গেছে। অধ্যাপক ক্যারল প্রাণী দেহেও একই ধরণের প্রমাণ পেয়েছেন। ইন ভিট্রোসমীক্ষাগুলোতেও নির্দেশিত হয়েছে যে, টোকোট্রায়েনল ভিটামিন ‘ই’ সফলভাবে ক্যান্সাররোধে সক্ষম এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর দেহে টোকোট্রায়েনলের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য যথেষ্ট সমর্থন যোগ্য
যুক্তি রয়েছে। পরিচিত কয়েকটি ভোজ্য তেল অথবা চর্বিতে বিদ্যমান কোলেস্টেরলের পরিমাণ- পাম তেলে ১৩-১৯ পিপিএম বা গড় ১৬ পিপিএম, সূর্যমূখী তেলে ৮-৪৪ পিপিএম বা গড় ১৭ পিপিএম, সয়াবীন তেলে ২০-৩৫ পিপিএম বা গড় ২৮ পিপিএম, সরিষা বা রেপসীড তেলে ২৫-৮০ পিপিএম বা গড় ৫৩ পিপিএম, ভূট্টার তেলে ১৮-২৫ পিপিএম বা গড় ৫০ পিপিএম, মাখন অথবা বাটার অয়েল ঘি ২২০০-৪১০০ পিপিএম বা গড় ৩১৫০ পিপিএম।
উপরোক্ত তথ্য সমূহ প্রমাণ করে যে, ভিটামিন ‘ই’ এবং ‘এ’-এর উপকারিতাসমূহ সঠিকভাবে পেতে হলে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ‘ই’ এবং ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।