দেশে করের আওতাবহির্ভূত কেহই নাই। সবাইকে কর দিতে হয়। সরাসরি না হউক, পরোক্ষভাবে হইলেও এই দেশের ধনী-গরীব সবাইকে কর দিতে হয়। কর আদায় নিশ্চিত করিতে কৌশল অবলম্বন করিয়া পরোক্ষ কর ব্যবস্থার প্রবর্তন করিয়াছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ফলে দেশে প্রত্যক্ষ কর দাতার সংখ্যা কম হইলেও বাস্তবে সব মানুষই করের আওতায় রহিয়াছে। ক্রেতা যখন ভোগ্যপণ্য কিংবা সেবা কিনিয়া থাকেন, সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রদান করিতে হয়। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের এই ব্যবস্থা চালু হইয়াছিল ৯০ দশকে। তখন বিরোধী পক্ষ (রাজনৈতিক) ইহার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন; কিন্তু পটপরিবর্তনের পর সবাই এই ‘আগ্রাসী’ কর আদায় ব্যবস্থাকে সমর্থন করিয়া ইহার ক্ষেত্র বাড়াইয়াছিলেন। বর্তমানে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র নাই, যাহা ভ্যাটের আওতামুক্ত। অনেক ক্ষেত্র রহিয়াছে যাহা ভ্যাটের মূল নীতির সহিত সাংঘর্ষিক। ভ্যাটের মূল নীতি হইতেছে, কোনো পণ্য বা কাঁচামাল দিয়া তৈরি পণ্য যেই পরিমাণ মূল্য সংযোজন করিল, তাহার উপর ১৫ শতাংশ হারে কর প্রদেয় হইবে। বাস্তবে মোট মূল্যের উপর ১৫ শতাংশ হারে কাটিয়া রাখা হয়। আবার মূল্য সংযোজন হয় না, এমন ক্ষেত্রেও ভ্যাট বসানো হইয়াছে। যাহার মুখ্য উদ্দেশ্য হইতেছে রাজস্ব আদায় বাড়ানো।
এই ভ্যাট ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনিবার দাবি উঠিলে নূতন একটি ভ্যাট আইন প্রণয়ন করা হয়। তাহাও ব্যবসাবান্ধব না হওয়ায় স্থগিত করা হয়। যাহার সময়সীমা এই জুনে ঘোষিতব্য বাজেটকালে শেষ হইয়া যাইতেছে। অর্থাত্ নূতন ভ্যাট আইন নূতন বাজেট ঘোষণার দিন হইতে কার্যকর হইতেছে; কিন্তু কী ধরনের সংশোধন করা হইয়াছে তাহা লইয়া অন্ধকারে রহিয়াছেন ব্যবসায়ীরা—এমন বক্তব্য আসিলে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বলিয়াছেন, তাহাদের সহিত আলোচনা করিয়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে। খবরে প্রকাশ, ভ্যাটের হার ৫, সাড়ে ৭, ১০ ও ১৫ শতাংশ হইবে। এনবিআর চেয়ারম্যান বলিয়াছেন, রেয়াত নিতে হইলে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হইবে। ইহার আগে অর্থমন্ত্রী বলিয়াছেন, ভ্যাটের হার হইবে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। তাহাতে অনেকের স্বস্তি আসিয়াছিল।
ভ্যাট এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া, যাহা খোদ প্রয়োগকারীরাও বোঝে না মর্মে বাজারে কথা চালু রহিয়াছে। তাই ইহার সহজীকরণ জরুরি। ব্যাংক ঋণের সুদের ‘কম্পাউন্ড’ হিসাবের মতোই ভ্যাটের হিসাব বোঝা দায় বলিয়া ব্যবসায়ীদের অনেকেই মনে করেন। তাহাদের মতে, এই জটিলতা রাখিয়া কখনো কখনো ভ্যাট ফাঁকিতে উত্সাহিত করা হয়। আবার ভ্যাট আদায়কারীদের প্রণোদনা দিবার নিয়ম থাকায় কয়েক বত্সর গরমিল হিসাব মানিয়া গেলেও পরবর্তীতে তাহার নিখুঁত হিসাব কষিয়া ভ্যাট ফাঁকি হইয়াছে বলিয়া চালাইয়া দেওয়া হয়। ইহাতে ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের উপর বাড়তি করের বোঝা চাপে আর কর্মকর্তারা ইহার বিনিময়ে প্রণোদনা পাইয়া থাকেন। অথচ তাহাদের নিয়মিত কাজের অংশই হইতেছে ভ্যাট সঠিকভাবে আদায় করা। কেহ ফাঁকি দিলে তাহা যদি ঐ সময়ে উদঘাটন না হয়, তাহা হইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনিবার কথা। তাহা না করিয়া প্রণোদনার বিধান ভ্যাট কাঠামোকে অসামঞ্জস্যতা দিয়াছে বলিয়া বিশেষজ্ঞমহল মনে করিতেছেন। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একজন উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী। তিনি নীতিনির্ধারকের আসনে বসিয়া এইবার জটিলতাগুলি দূর করিবেন। কেননা উচ্চ সুদ হারের মতো উচ্চহারে কর চাপাইয়া দিয়া ব্যবসা বিনষ্ট না করিয়া ভ্যাট-ট্যাক্স কমাইয়া ব্যবসায় গতি আনিতে পারিলে আদায় বাড়িবে, বাড়িবে প্রবৃদ্ধি। সুযোগ হইবে নূতন কর্মসংস্থানের। তাহা অনুধাবন করিয়া অর্থমন্ত্রী মহোদয় নূতন বাজেটে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন বলিয়া আমরা আশা করি।