শিশুদের সামলানো খুব সহজ ব্যাপার নহে। বিশেষ করিয়া অবোধ শিশুদের সামলাইতে বাবা-মাকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হয়। একইসঙ্গে শিশুটির জন্য সময়ও ব্যয় করিতে হয় যথেষ্ট পরিমাণে; কিন্তু এই গুড প্যারেন্টিংয়ের ব্যাপারে কতজন বাবা-মা সচেতন? বরং আমরা দেখিতে পাই, বাচ্চারা একটু দুষ্টুমি করিলে একটি স্মার্টফোন শিশুর হাতে তুলিয়া দেওয়া হয়। ব্যাস আর কোনো চিন্তা নাই। স্মার্টফোনের ফ্যান্টাসি জগতে আটকাইয়া যায় শিশুটির মনোজগত্। সকল কিছু ভুলিয়া শিশুটি তখন বুঁদ হইয়া তাকাইয়া থাকে স্মার্টফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে।
ইহাতে শিশুদের মনোজগতে কী কী ধরনের মানসিক সমস্যা জাঁকিয়া বসিতেছে, তাহা লইয়া মনোবিদদের চিন্তার শেষ নাই। তবে শারীরিক সমস্যার দিকটিও কম দুশ্চিন্তার নহে। বিশেষ করিয়া দৃষ্টিশক্তির বিষয়ে। সম্প্রতি শিশুদের ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা অশনি সংকেত হিসাবে দেখা দিতেছে। বিশেষ করিয়া এক দশকের ব্যবধানে মায়ের কোল হইতেই চোখের রোগ মায়োপিয়া বা চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিতে আক্রান্ত হইতেছে শিশুরা। ইহা লইয়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গত কয়েক বত্সরে বেশ কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে। সম্প্রতি রাজধানীর একটি স্কুলে দেখা গিয়াছে একটি শ্রেণির ১৯ জন শিক্ষার্থীর ৭ জনই কোনো না কোনো চোখের সমস্যায় ভুগিতেছে। আর এই সমস্যায় ভোগা অধিকাংশ শিশু শিক্ষার্থীর সময় কাটে ফেসবুক, ইউটিউব ও ভিডিও গেমসে। গ্রামে যেহেতু এখনো ফোরজি ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যাপক আকারে ছড়াইয়া পড়ে নাই, সেই কারণে গ্রামের চাইতে শহরের শিশুদের চোখে এই সমস্যা অনেক বেশি আকারে দেখা যাইতেছে।
বিশেষজ্ঞরা দেখিয়াছেন যে, ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যায় শিশুরা সাধারণত ৮ হইতে ৯ বত্সরের পর আক্রান্ত হয়; কিন্তু বর্তমানে দুই হইতে তিন বত্সর বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হইতেছে এই রোগে। চক্ষুবিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, অক্ষিগোলকের আকৃতি যখন স্বাভাবিক থাকে, তখন শুরুতেই আলো গিয়া পড়ে মানুষের চোখের মণি তথা কর্নিয়াতে। সেইখান হইতে মণির ভিতরের আরো কালো যেই অংশ, সেই নয়নতারা তথা পিউপিল এবং লেন্স হইয়া আলো অক্ষিপটে তথা রেটিনায় পৌঁছায়। অক্ষিপটের কোষগুলি উদ্দীপ্ত হইয়া মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাইলে তবেই মানুষ দেখিতে পায়; কিন্তু লম্বা সময় চোখের খুব সামনে রাখিয়া শিশুরা যখন কম্পিউটার, ট্যাব বা মোবাইল ফোনে গেমস খেলে, তখন চোখ বিশ্রাম পায় না। চোখের মাংসপেশিগুলি সংকুচিত হইয়া যায়। এই কারণে শিশুর চোখ আর চশমা ছাড়া দূরের জিনিস দেখিতে পায় না।
সম্প্রতি জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ কর্তৃক প্রকাশিত একটি তথ্যে জানা গিয়াছে, প্রতিদিন সারা বিশ্বে পৌনে দুই লক্ষ শিশু নূতন করিয়া ইন্টারনেটের সহিত যুক্ত হইতেছে। বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া বাংলাদেশও যেহেতু ডিজিটাল স্রোতে ছুটিয়া চলিতেছে, সুতরাং এই সমস্যা আগামীতে আমাদের দেশেও আরো প্রকট আকার ধারণ করিবে। সমস্যাটি যেহেতু আধুনিক প্রযুক্তির কারণে, আরো উন্নত প্রযুক্তি আসিয়া নিশ্চয়ই এই সমস্যার উপযুক্ত সমাধান বাহির করিবে। ততদিন অবধি আধুনিক বাবা-মাকে সচেতন হইতে হইবে তাহার প্রিয়তম সন্তানকে স্মার্টফোনে আসক্ত করিবার ব্যাপারে।