[ রা জ নী তি ]

দেশের রাজনীতি কোন পথে

৬ জুলাই রাতে গাজীপুর নির্বাচনের ফল নিয়ে কথা হচ্ছিল আমার এক পরিচিতজনের সঙ্গে। তিনিও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান এবং দৈনিক ইত্তেফাকে কলাম লিখেন। নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা এবং ভোটের ব্যবধান ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। প্রার্থীর যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও অঞ্চলগত অবস্থানের বিচারে গাজীপুরে আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে বিএনপির চেয়ে এগিয়ে ছিল। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খান ১৮ বছর ধরে টঙ্গী পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণমুখী, শিক্ষিত ও কর্মচঞ্চল মানুষ হিসেবে তাঁর সুনাম অটুট ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর তেমন কোনো অভিযোগ কিংবা বড় ধরনের সমালোচনা ছিল না। সে তুলনায় বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া অঞ্চলগত শক্তির দিক দিয়েও গাজীপুর বহু বছর ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি সংসদীয় নির্বাচনে গাজীপুর আসনে জয়লাভ করেছে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে গাজীপুরের সকল সংসদীয় আসন পায় আওয়ামী লীগ। এসব বিবেচনায় গাজীপুরে আজমত উল্লার বিজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও উল্টো তিনি হেরেছেন এক লাখ ছয় হাজার ৫৭৭ ভোটের ব্যবধানে। নিজের এলাকা টঙ্গীতে ১৩৩টি কেন্দ্রের ১০০টিতেই পরাজিত হয়েছেন আজমত উল্লাহ। ভোটের ব্যবধান প্রসঙ্গে আমার ওই সহকর্মী তামাশা করে বলে উঠলেন, ‘দেশের জনগণের সরকারবিরোধী মনোভাব এতোটাই প্রকট যে, বিএনপি এখন কলাগাছকে প্রার্থী দিলেও জিতবে’। অবশ্য যে যা-ই বলুক, আর যা-কিছু ভাবুক; আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আসছে ভিন্ন কথা। দলটির নেতারা একদিকে যেমন বিজয়ী মেয়রদের ‘সন্ত্রাসী-খুনী’ অ্যাখ্যা দিয়ে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ করছেন; আবার নিজ দলের বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনো কিছু না জানার ভান করছেন। হাস্যকর ব্যাপার বৈকি! প্রধানমন্ত্রী গত ১৩ জুলাই গণভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “যারা সত্, যারা উন্নতি করেছে—তারা ভোট পায়নি। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি আর খুনের সঙ্গে জড়িত, তারা জিতে এল।” কেন তা হল— এর উত্তর নিজে জানেন না জানিয়ে তা খুঁজতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। একই দিনে চাঁদপুর সার্কিট হাউসে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়ীদের অনেকেই দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও হত্যা মামলার আসামি বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘‘কীভাবে ভোটাররা তাদের জয়যুক্ত করেছে তা বোধগম্য নয়। আমাদের প্রার্থীরা যোগ্য থাকা সত্ত্বেও কেন পরাজিত হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’ একদিকে বিএনপির ‘সন্ত্রাসী (!)’ প্রার্থীদের নির্বাচনে সফলতার কারণ জানেন না প্রধানমন্ত্রী; আর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী দীপু মনির কাছে ভোটারদের বিএনপিকে সমর্থনের কারণ পরিষ্কার নয়। নিকট অতীতেও দেশবাসী দেখেছে, প্রধানমন্ত্রী দেশের ভবিষ্যত্ পরিস্থিতি নিয়ে কত দৃঢ়তার সঙ্গে অকপটে মন্তব্য করেছেন। গেল মাসের ২১ তারিখে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর আগাম সতর্কবার্তা ছিল: ‘তত্ত্বাবধায়ক এলে আপনাকেও জেলে যেতে হবে, আমাকেও জেলে যেতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে নির্বাচন হবে না।’ আর ২২ জুন রংপুরের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধাযক সরকার এলে অতীতের মতো কিছু লোক পাওয়া যাবে যারা বলবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার রোজ কিয়ামত পর্যন্ত থাকতে পারবে।’ অথচ সরকারের এতো গোয়েন্দা সংস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী খুঁজে বের করতে পারলেন না পাঁচ-পাঁচটি সিটিতে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পরাজয়ের কারণ কী। আর আওয়ামী লীগ নেতারা তো আর জনসাধারণের সঙ্গে মেলামেশা করেন না; সম্ভবত পত্রিকা পড়াও তারা ছেড়ে দিয়েছেন, টিভিতে সংবাদ বা টকশো দেখার সময় পান না; এবং জনমত উপলব্ধি করার বোধশক্তিও তারা হারিয়ে ফেলেছেন। এ কারণে নির্বাচনের ফলাফলের রহস্য বুঝতে তাদের এতো কষ্ট হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীনদের ধারাবাহিক বিপর্যয়কে জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন তথা সরকারের প্রতি ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছে সবাই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি মহাজোট সরকার। দেশ পচািলনায় ব্যর্থতা, সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি এবং বিরোধী দল ও মতের ওপর দমন-পীড়ন নীতির কারণে মানুষের ক্ষোভ আর অসন্তোষ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। কথায় আছে, ‘Voice of the people is the supreme law’, অর্থাত্—‘জনগণের কণ্ঠস্বরই শ্রেষ্ঠ আইন’। অথচ দেশের জনগণের শতকরা ৯০ ভাগ পক্ষে থাকলেও সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে সরকার। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গত বছর দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় রেলমন্ত্রী পবন কুমার বানসাল ও আইনমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার পদত্যাগ করেন। আর আমাদের দেশে পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন বাতিল করলেও অভিযুক্ত মন্ত্রীকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন বহাল রাখা হয়েছে। হলমার্ক নামক একটি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট করলেও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘চার হাজার কোটি টাকা তেমন বেশি নয়’। ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল রেলের অর্থ কেলেঙ্কারির দায় নিজের মাথায় নিয়ে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত পদত্যাগ করে রেলমন্ত্রীর পদ ছাড়লেও শেষমেশ তাকেও মন্ত্রীর পদে রাখা হয়; বানানো হয় দপ্তরবিহীন মন্ত্রী। হিসাবে দেখা গেছে, একজন মন্ত্রী ও তাঁর পিএস, এপিএস ও সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পেছনে সরকারের এক মেয়াদে বা পাঁচ বছরে রাষ্ট্রের কম করে হলেও ব্যয় করতে হয় তিন কোটি ৬৫ লাখ ৯০ হাজার ৪০০ টাকা। সুরঞ্জিত সেন গত ১৫-১৬ মাস ধরে মন্ত্রী হিসেবে সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। গত প্রায় পৌনে পাঁচ বছরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে সবাই। সম্প্রতি চট্টগ্রামে রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের মধ্যে সংঘর্ষের বলি হয়েছে ছোট্ট শিশু। শেয়ারবাজার কেলেংকারির মাধ্যমে লাখো কোটি টাকা লুট হয়ে গেছে—সর্বস্বান্ত হয়েছেন লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানবাধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হয়েছে লাগামহীনভাবে। বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন-মামলা-হত্যার ঘটনা ৯১ পরবর্তী গণতান্ত্রিক আমলের যেকোনো সরকারের তুলনায় বেশি হয়েছে। আসলে আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনরা সবসময় জনগণকে বোকা ভাবে। কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষী দেয়, জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানে ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব ও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা মনে রেখে ৯১ সালে জনগণ রায় দেয় বিএনপিকে। যদিও ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পেয়েছিল। কিন্তু, দেশ পরিচালনায় বিএনপির ব্যর্থতার কারণে ৯৬’র নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। আবার, আওয়ামী লীগ আমলে সর্বগ্রাসী সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যে অতিষ্ট জনগণের ভোটে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পরবর্তীতে, জোট আমলে লাগামহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতায় টিকে থাকতে নানামুখী অপচেষ্টায় হতাশ হয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের পক্ষে যায়। এমনিতেই জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে সরকারবিরোধী প্রবণতা বা মনোভাব সক্রিয় থাকে। তার ওপর ক্ষমতাসীনদের অপশাসন ‘আগুনে ঘি ঢালা’র মতো অবস্থা সৃষ্টি করে। এছাড়া দেশে এখন শিক্ষার হার বেড়েছে, সচেতনতাও ক্রমশ বাড়ছে। গণমাধ্যমের দর্শক-পাঠক-শ্রোতার সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তদুপরি অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে কোনো ঘটনা এখন আর মানুষের অজানা থাকে না। সরকারের ভালো-মন্দ কর্মকান্ড জানতে মানুষের আর বেগ পেতে হয় না। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দেশবাসী অতীতেও যেমন ভুল করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। আগে দেশের মানুষ শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করতো। এখন তার ভাবনায় সুশাসন, অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধি, উন্নতি—এসব বিষয়ও প্রাধান্য পায়। পাঁচ সিটিতে নির্বাচনে ভরাডুবির পর কেউ কেউ ভেবেছিলেন, সামনের দিনগুলোতে সরকার নমনীয় হতে পারে। বিশেষ করে বহুল আলোচিত লিমনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা দুটি প্রত্যাহারের পর আশান্বিত হয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু, কোটাবিরোধী আন্দোলন দমন করতে সরকার যেভাবে পুলিশ ও ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়েছে, তাতে মনে হয়েছে আওয়ামী লীগের ঘুম এখনো ভাঙেনি। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের অভিমত এবং মেধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের মুখে সরকার যখন যৌক্তিক পথে না গিয়ে লাঠি দিয়ে, হাতকড়া পরিয়ে, জামায়াত-শিবির হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে ঠেকাতে চেয়েছে—তখন এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিরোধী মতের ওপর থেকে দলন-পীড়নের পথ থেকেও সরকার সরে আসেনি। গত ১৬ জুলাই কথা হচ্ছিল বিএনপির এক অঙ্গ সংগঠনের সভাপতির সঙ্গে। তিনি জানান, সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন নয় মাস আগে; আর গত সাত মাস ধরেই তিনি আত্মগোপনে আছেন। বর্তমানে মাত্র ৪৪টি (!) মামলা আছে তাঁর বিরুদ্ধে। সিটি নির্বাচনের পর পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং আরও নতুন নতুন মামলা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি। এছাড়া গত কয়েকদিনে সহিংসতায় আবারও বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে। উন্নত গণতন্ত্রে সরকারের মেয়াদের মধ্য বা শেষভাগে নির্বাচনে পরাজয় কিংবা বিভিন্ন জরিপে জনপ্রিয়তা হারানোর স্পষ্ট আলামত ফুটে উঠলে আগাম নির্বাচন দেওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর আমাদের দেশে ঘটছে উল্টো ঘটনা। পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ভরাডুবির পরও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কথা সমানতালে প্রচার করা হচ্ছে। গাজীপুর নির্বাচনের পর পরই যুক্তরাজ্যে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে দেশটির কয়েকজন পার্লামেন্ট সদস্যের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনাদের দেশে যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, বাংলাদেশেও সেভাবে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ যা হোক, সিটি নির্বাচনের ফলাফল আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর নয়। এটিকে আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক পরাজয়ের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন আওয়ামী লীগের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে। প্রথমটি হচ্ছে, পাঁচ সিটিতে নির্বাচনের রায়কে শ্রদ্ধা করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে জনমতকে মেনে নিয়ে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ-সমঝোতায় আসা। এটিই হচ্ছে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পথ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নিতান্ত বাধ্য না হলে আওয়ামী লীগ জনগণের প্রত্যাশা ও বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার ঝুঁকি নিবে না। দ্বিতীয় রাস্তা হচ্ছে, ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি এড়াতে পছন্দমতো একদলীয় একটি নির্বাচন আয়োজন করা। বিএনপি ১৯৯৬ সালে এ ধরনের একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেও চার মাসের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। আর তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে, নির্বাচন না দিয়ে প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে হলেও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করা। অবশ্য সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী অনুযায়ী নির্বাচন না হলে সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সুযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ কোন পথে হাঁটবে—এটি নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে মনে রাখতে হবে, দুই বছরের কিছু সময় আগে উত্তাল হয়ে উঠা মিসরের তাহরির স্কয়ারের ঢেউয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন দেশটির তিন দশকের শাসক হোসনি মোবারক; সেই তাহরির স্কোয়ারের মাত্র চার দিনের আন্দোলনেই সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। আর প্রভাবশালী সেনাবাহিনী এ ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে পক্ষ নিয়ে বিষয়টিকে সহজ করে দিয়েছে। ফল হিসেবে ক্ষমতায় বসার মাত্র এক বছরের মাথায় বিদায় নিতে হয়েছে মুরসিকে। এখন দেখা যাক, আমাদের এখানে এখানে কী হয়? লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়