টেলিটকের অপহূত কর্মীদের উদ্ধার

টেলিটকের সহযোগী একটি প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কর্মীকে অপহরণের পর নয়দিন অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। শেষ হইয়া গিয়াছে পুলিশ প্রশাসনের বাঁধিয়া দেওয়া সময়সীমাও। কিন্তু তাহাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই। ফলে অপহূতদের স্বজন ও সহকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের উদ্বেগ বাড়িয়াই চলিয়াছে। উল্লেখ্য যে, গত ৮ জুলাই রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যায় টেলিটকের একটি টাওয়ারের কাজ তদারকির সময়ে অস্ত্রের মুখে তাহাদের অপহরণ করা হয়। মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করাই যে অপহরণকারীদের উদ্দেশ্য তাহা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। অপহূত কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সমঝোতার উদ্যোগও নেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু অপহরণকারীদের ক্রমবর্ধমান মুক্তিপণ দাবির কারণে তাহা ব্যর্থ হইয়া যায়। অপহূতদের উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টাই চালানো হইতেছে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও অংশগ্রহণ করিয়াছে উদ্ধার অভিযানে। সেই সাথে অব্যাহত আছে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও। রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপার বলিয়াছেন যে, তাহারা আলোচনা ও সমঝোতার উপর গুরুত্ব দিতেছেন। এই লক্ষ্যে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখিতেছেন অপহরণকারীদের সাথে। সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হইলে কঠিন পন্থা অবলম্বন করা হইবে বলিয়া হুঁশিয়ার করিয়া দেওয়া হইয়াছে স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর পক্ষ হইতে। ইতিমধ্যে সেই প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হইয়াছে। সব মিলাইয়া, সরকারের দিক হইতে আন্তরিকতার কোনো অভাব না থাকিলেও অপহূতদের উদ্ধারের ব্যাপারে পুরোপুরি উদ্বেগমুক্ত হওয়া যাইতেছে না। আর এই উদ্বেগ যে কেবল কয়েকটি পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। উদ্বেগ এককথায় বহুমাত্রিক। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি যদিও কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নহে, তথাপি সেই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাকেও ছাপাইয়া উঠিয়াছে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন তত্পরতা বিঘ্নিত হইবার আশঙ্কা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দীঘদিন যাবত্ সেইখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক সমপ্রসারণের দাবি জানাইয়া আসিতেছেন। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে এই নেটওয়ার্কের গুরুত্ব ও আবশ্যকতা কতোখানি—তাহাও ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সর্বপ্রকার উন্নয়ন ও অগ্রগতির পূর্বশর্ত হইল শান্তি ও স্থিতিশীলতা। উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের ধারা অব্যাহত রাখিতে হইলে স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো বিকল্প নাই। কিন্তু সেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিই ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী তিন ইউরোপীয় নাগরিকের অপহরণের ঘটনাটি ঘটিয়াছিল ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ইহার পর সাময়িকভাবে স্বস্তির যেই বাতাবরণটি পরিলক্ষিত হইয়াছিল তাহা যে ধসিয়া পড়িবার উপক্রম হইয়াছে তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। লক্ষণীয় যে, পার্বত্য জনসংহতি সমিতির বেশকিছু সদস্য অপহূত হইয়াছিলেন গত ফেব্রুয়ারি মাসে। তাহাদের অনেকেই এখনও নিখোঁজ। শুধু তাহাই নহে, প্রায় প্রতিনিয়তই রক্তক্ষয়ী সংঘাত, হত্যা, অন্তর্কলহ ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটিতেছে। টেলিটকের সাথে সংশ্লিষ্ট পাঁচ কর্মীর অপহরণও সেই অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পার্বত্যবাসীর স্বার্থেই অবিলম্বে এই অবস্থার অবসান হওয়া উচিত। অবশ্য কথাটি বলা যতো সহজ কাজটি মোটেও ততোটা সহজ নহে। কারণ সমস্যাটি জটিল শুধু নহে, অত্যন্ত নাজুকও বটে। যতো সদিচ্ছাই থাকুক না কেন, শুধু সরকার বা প্রশাসনের একার পক্ষে ইহার সমাধান সম্ভব নহে। বলা বাহুল্য, টেলিটক কর্মীদের উদ্ধারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাত্ক্ষণিক লাভক্ষতি বা সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠিয়া স্থানীয় নেতৃবৃন্দকেও এই ব্যাপারে উদারচিত্তে আগাইয়া আসিতে হইবে। প্রসারিত করিতে হইবে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত। মনে রাখিতে হইবে যে, পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত হইলে তাহার পরিণতি কাহারও জন্য সুখকর হইবে না।