স্বাস্থ্যকথা
রোগব্যাধিতে রোজার বাধ্যবাধকতা শিথিল
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৭
অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান রমজান মাসে রোজার বাধ্যবাধকতা, সাধারণ সুযোগ-সুবিধে বা ছাড় সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে অবহিত না হওয়ার কারণে মারাত্মক অসুস্থতা নিয়েও রোজা পালন করে থাকেন। আমরা অনেকেই জানি না বা সঠিকভাবে উপলব্ধি করি না এবং ধর্মের বিধান জানা সত্ত্বেও কেউ যদি অসুস্থতা নিয়ে রোজা পালন করতে গিয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, তবে তা হবে স্পষ্টত শরীর ও মনের ওপর জুলুম বা অত্যাচার। কতকগুলো বিশেষ ধরনের রোগ-ব্যাধি নিয়ে রোজা পালন করলে স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এসব জটিল রোগ নিয়ে রোজা পালন না করাই শ্রেয়। অবশ্য তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শারীরিক সামর্থ্যের ওপর।
রোজার সাথে না খেয়ে থাকার একটা সম্পর্ক আছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, রমজান মাসে পেটে অ্যাসিড্ ও পেপিসন নিঃসরণ বেড়ে যায়। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমজান মাসে পেপিটক আলসারের জটিলতা বিশেষ করে রক্তক্ষরণ ও পারফোরেশন বৃদ্ধি পায়। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ, যারা আলসারের রোগীদের ওপর রোজার প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন, তারা মনে করেন, পেপিটক আলসারের কারণে রক্তক্ষরণ বা পারফোরেশন হয়ে গেছে কিংবা এর আরোগ্যের সময় রোগীর রোজা পালন বাধ্যতামূলক নয়। এ অবস্থায় রোজা রাখা হলে রোগীর আরোগ্য লাভ ব্যাহত হতে পারে।
ডায়াবিটিজ রোগীদের অনেকেই রোজা না রাখার কারণ হিসেবে উল্লেখিত রোগটির কথা উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবিটিজে আক্রাস্ত রোগীদের ক্ষেত্রে রোজা রাখতে কোন নিষেধ নেই। যেসব ডায়াবিটিজ রোগী খাবার এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, তাদের জন্য রোজা রাখা খুবই সহজ। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা উপকারীও বটে। যারা মুখে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবিটিজ নিয়ন্ত্রণে রাখছেন, তারাও চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখতে পারবেন। তবে ব্যায়াম করার ক্ষেত্রে তাদের সতর্ক থাকতে হবে। রোজা রেখে দিনের বেলা অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ব্যায়াম না করাই ভালো। এতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাত্ কমে যেতে পারে এবং অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার কারণে দিতে পারে পানি শূন্যতা। সন্ধ্যার পর হালকা ব্যায়াম বা আধা ঘণ্টা হাঁটা যেতে পারে। যাঁরা নিয়মিত তারাবির নামাজ আদায় করে থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এটাই ব্যায়ামের বিকল্প। আলাদা করে ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, রোজা রেখে রক্তের গ্লুুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করালে তাতে রোজা নষ্ট হয় না। রমজান মাসে বাড়িতে গ্লুকোমিটার দিয়ে মাঝেমধ্যে নিজের রক্তের গ্লুুকোজের মাত্রা মেপে দেখতে হবে। সপ্তাহে অন্তত এক বা দুই দিন সেহরির দুই ঘণ্টা পর এবং ইফতারির অন্তত আধ ঘণ্টা আগে গ্লুুকোজ মাপুন। সেহরির পর রক্তে গ্লুুকোজের মাত্রা আট মিলিমোল বা এর কম এবং ইফতারির আগে ছয় মিলিমোল বা এর কম থাকা বাঞ্ছনীয়। এর মধ্যে দিনের যেকোনো সময় খারাপ লাগলে বা শরীর কাঁপলে, ঘেমে ওঠলে, মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগলে অবশ্যই গ্লুুকোজ মাপুন। দিনের যেকোনো সময়ে গ্লুুকোজ ৩ দশমিক ৩ মিলিমোল বা তার কম এবং দিনের পূর্বাহ্নেই ৩ দশমিক ৯ মিলিমোল বা তার কম হয়ে গেলে সেদিন রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। দিনের যেকোনো সময় রক্তে গ্লুুকোজ ১৬ মিলিমোলের বেশি হয়ে গেলেও রোজা ভাঙতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণসহ কলস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও রোজা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোজা রাখার ফলে রোগীদের কলেস্টরলের মাত্রা প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে। একই সঙ্গে তাদের উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতাও কমে যায়। যারা হূদরোগে ভোগছেন, তাদের নিয়মিত এবং ঠিক সময়মতো অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সেবন করতে হয়। হূদরোগ নিয়ে যারা রোজা পালন করতে চান, তাদের অবশ্যই রোজা শুরু করার আগে নিজ নিজ চিকিত্সকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলে রোজা পালন থেকে বিরত থাকা যায়। হূদরোগীদের সর্বক্ষণ নাইট্রোগ্লিসারিন জাতীয় সেপ্র সঙ্গে রাখতে হয়। এ সেপ্র নেয়া ধর্মীয় আইন বিরুদ্ধ নয়। রোজা নষ্ট হওয়ার ভয়ে প্রয়োজন সত্ত্বেও এ সেপ্র না নিলে রোগীর জীবন হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।
উপসংহারে বলতে চাই, নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগে কিংবা সামান্য অসুস্থতায় রোজা রাখতে কোন বিধিনিষেধ নেই। বরং রোজা এক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে তীব্র অসুস্থতায় কিংবা জটিল রোগে রোজা রাখা যৌক্তিক নয়। সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন। একজন মুসলমান পবিত্র কুরআন, হাদিস ও তাকওয়ার ভিত্তিতে শরীর ও মনের ওপর জুলুম না করে রোজা পালন করবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিভিন্ন নেয়ামত ও সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য শোকরিয়া আদায় করবে, এটাই ধর্মীয় বিধান।
লেখক :হূদরোগ বিশেষজ্ঞ
ইমেইল: dr.rezaul2009@gmail.com