সৃষ্টির মাঝে বেঁচে থাকবেন হুমায়ূন আহমেদ

বেঙ্গল শিল্পালয়ের দেয়ালজুড়ে হুমায়ূনের ছবি। তার বর্ণময় জীবনের খণ্ড খণ্ড অংশ। আলোকচিত্রী নাসির আরী মামুনের ক্যামেরায় তোলা সেসব ছবিতে কোথাও তিনি গভীর মনোযোগে লিখছেন, কোথাও আবার ছোট্ট শিশু নিষাদ নিনিতের সঙ্গে খুনসুটি করছেন। বাংলা সাহিত্যের নন্দিত এই লেখক আজ নেই। তবে তার সৃষ্টির মধ্যেই বেঁচে থাকবেন তিনি। বেঁচে রইবেন মানুষের হূদয়ে। গতকাল শনিবার ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশকবৃন্দ তার প্রথম প্রয়াণ দিবসে স্মরণ সভার আয়োজন করে। স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্য সচিব মুফিদুল হক, বন্ধু-সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক শফি আহমেদ, আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, নাসরিন জাহান, শ্বশুর প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী প্রমুখ। স্মরণ সভায় পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও ছোট ভাই কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব এবং প্রকাশকদের পক্ষে অবসর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আলমগীর রহমান বক্তব্য রাখেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, সাহিত্যে তার যে অমরতা ইচ্ছা করলেও তা কাটানো যাবে না। আর শোক নয়, ভালোবাসা ও আনন্দ দিয়ে তাকে স্মরণ করতে হবে। কারণ, জীবন উপভোগের মাধ্যম তিনি সৃষ্টি করে গেছেন। এ কারণেই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষনের মাধ্যমে এই লেখককে আমরা স্মরণ করে যাবো আজীবন। তিনি বলেন, ‘হুমায়ূন আহমদে ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তার সৃষ্টিশীল পরিভ্রমণে আমরা পেয়েছি অজস্র গল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা, ভ্রমণ কাহিনী। এর বাইরে তার কাছ থেকে পেয়েছি নাটক, চলচ্চিত্র ও গান। বহুমাত্রিকভাবে তিনি সাহিত্য ও শিল্পে বিচরণ করেছেন। তার জনপ্রিয়তাকে অনেকেই বাঁকাভাবে উপস্থাপন করেন; কিন্তু জনপ্রিয় লেখক হওয়া যে কত কঠিন তা অজনপ্রিয় লেখক মাত্রেই জানেন। অজনপ্রিয় মানেই যে তা বাজে সাহিত্য—এভাবে দেখার কিছু নেই।’ মেহের আফরোজ শাওন হুমায়ূন আহমেদের রচনাকে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে তা প্রকাশের আবেদন জানান প্রকাশকদের প্রতি। তিনি বলেন, আমরা বাংলা ভাষাভাষিরা অনেক ভাগ্যবান, কারণ আমাদের হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন লেখক আমরা পেয়েছি। তিনি কেনো শুধু বাংলা ভাষাভাষিদের লেখক হয়ে থাকবেন? তার ইচ্ছা ছিলো দেশের বাইরের প্রকাশনা সংস্থা থেকে বই বের হবে। তার প্রকাশকদের কাছে অনুরোধ, ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন। আহসান হাবীব বলেন, ‘শুক্রবার বড় ভাইয়ের প্রথম প্রয়াণ দিবসের দিন সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমার কাছে ফোন এসেছে। যারা ফোন করেছেন, তারা তার পাঠক। তারা নিজেদের উদ্যোগে হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করেছেন। এই যে মানুষের এত ভালোবাসা, তার জন্যই তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। আর এর মাধ্যমেই আমরা আমাদের শোককে কিছুটা কমিয়ে আনতে পারবো।’ রাশেদা কে চৌধুরী হুমায়ূন আহমেদ প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠকে সরকারি করার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘তিনি শিক্ষানুরাগী ছিলেন বিধায় দেশের সকল শহীদদের নামে শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ তৈরি করেছিলেন। মুফিদুল হক বলেন, ‘মানুষের মুখের ভাষাকেই সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। তবে তার ছোটোগল্প বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘদিন মাইলফলক হয়ে থাকবে। গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘তার স্মরণ সভায় অংশ নিতে হবে কখনো কল্পনাও করিনি। নুহাশ পল্লীতে শেষবার গিয়েছিলাম, সেদিন আমি আমার পরিবারকে নিয়ে সারাদিন ছিলাম। সারাদিন হৈ চৈ করেছি। সেদিন কখনোই মনে হয় নি তিনি আর ফিরে আসবেন না।’ মতিউর রহমান বলেন, হুমায়ূন গণতন্ত্রমনা, প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। দেশের যে কোন সংকটময় মুহূর্তে তিনি লিখেছেন। আনিসুল হক বলেন, তিনি জীবনবাদী ছিলেন বলেই জীবনকে উপভোগ করেছেন। আজকে আমরা যে আয়োজন করেছি, হয়তো তিনি তা দেখে হাসছেন। কারণ, তিনি নিজের জীবদ্দশায় শোকসভা করেছিলেন। যাতে তিনি সবাইকে অনুকরণ করে কথা বলেছিলেন। নাসির আলী মামুন বলেন, আমি আমার আলোকচিত্রী জীবনে বিশ্বের অনেক বিখ্যাত মানুষের ছবি তুলেছি। তাদের সান্নিধ্যে এসেছি; কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের মতো এত নির্মোহ ও ইনফরমাল মানুষ দেখিনি।