ঈদের পর মাঠে নামার প্রস্তুতি দুই জোটের
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৩, ২৩:০৫
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই আসন্ন রোজার ঈদের পর ‘সর্বশক্তি’ দিয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারি দলের লক্ষ্য, বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলা এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ‘অপপ্রচার’ -এর জবাব দেয়া। আর প্রধান বিরোধী দলের লক্ষ্য হচ্ছে- আন্দোলন জোরদার করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবি মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করা। তবে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরেরই প্রধান লক্ষ্য আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালী করে নিজেদের পক্ষে জনসমর্থন বৃদ্ধি। শুধু দুই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, জামায়াত ও হেফাজতে ইসলামও ঈদের পর মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই জোটেরই মাঠে নামার ঘোষণায় ধারণা করা হচ্ছে, ঈদের পর রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের শনিবারের ছাপা সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে- আগামী ছয় মাস বাংলাদেশে খুবই অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্মানে দেয়া এক ইফতার পার্টিতে বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ঈদের পর জোরালো কর্মসূচি দেয়া হবে। এজন্য নেতা-কর্মীদের এখনই তৈরি হতে হবে। এই আন্দোলন সফল করতে সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর, বিভিন্ন পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় সরকারের দলীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। এর কয়েকদিন আগে বিএনপি প্রধান দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি একসঙ্গেই নিতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, ঈদের পর আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলব। আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে দলের সিনিয়র নেতারা টিম ভাগ করে বিভিন্ন জেলা সফর করবেন। এরপর আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে যাবে বিরোধী দল। যে আন্দোলনে সরকার দাবি মানতে বাধ্য হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি সবসময়ই গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী একটি দল। সে কারণে আন্দোলন ও নির্বাচন উভয় প্রস্তুতিই একসঙ্গে নেব আমরা।
আওয়ামী লীগও ঈদের পর সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভা শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের চালানো বিভিন্ন অপপ্রচার সম্পর্কে দেশের মানুষকে সজাগ করার লক্ষ্যে ঈদের পর দলের বিশেষ টিম সারাদেশে গণসংযোগ করবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি তত্ত্বাবধানে এসব টিম কাজ করবে। আওয়ামী লীগ সম্পাদক এও জানিয়েছেন, পাশাপাশি সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাই এবং তৃণমূলে সংগঠনকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে কাজ করবে এসব টিম।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করার জন্য ইতিমধ্যেই সব নির্বাচনী এলাকায় দলীয় সংসদ সদস্যরা গণসংযোগ শুরু করেছেন। ঈদের পর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও বিভিন্ন টিমে ভাগ হয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সফরে যাবেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দলের সংসদ সদস্যদের সাথে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দূরত্ব ও কোন্দল নিরসনে কাজ করবেন। এসব সাংগঠনিক সফরের খবর এবং মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত অবস্থা দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অবহিত করবেন।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশের মানুষ এখন নির্বাচনমুখী। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়াতে মানুষের ভেতরে আত্ম বিশ্বাস ফিরে এসেছে যে, দলীয় সরকারের অধীনেও তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা উঠে গেছে। কাজেই সেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য আন্দোলনের হুমকি দিয়ে কোন লাভ হবে না।
এদিকে, একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের রায় কার্যকর প্রতিরোধে ঈদের পর পূর্ণ শক্তি দিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত-শিবিরও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েকদিনে একাধিকবার বলেছেন, এ সরকারের আমলেই কয়েকটি রায় কার্যকর করা হবে। বর্তমান সরকার যেন কোনো রায় কার্যকর করতে না পারে, সেজন্য তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নতুন করে তৈরি হচ্ছে জামায়াত-শিবির। এছাড়া হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে বলেছেন, দেশের ‘আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার যে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে, যে রক্ত ঝরানো হয়েছে, ঈদের পর এর জবাব দেয়া হবে।’
বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংলাপের মাধ্যমে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের সমাধানের সম্ভাবনা নেই, এমনটি তারা ধরেই নিয়েছেন। এ অবস্থায় রোজার ঈদের পর থেকে বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষদিন পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলনের বিকল্প দেখছে না দলটি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হোক; কিন্তু সরকার তাতে আগ্রহী হয়। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ঈদের পর আন্দোলন জোরদার করা হবে।
জানা গেছে, ঈদের পর আন্দোলনের সম্ভাব্য কর্মসূচির মধ্যে হরতালই থাকবে বেশি। এছাড়া সভা-সমাবেশ, মিছিল, দলীয় চেয়ারপারসনের কয়েকটি জেলা সফরও এই কর্মসূচির মধ্যে থাকবে। আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নেয়া শুরু করেছে বিএনপি। নির্বাচন প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি বিভাগে স্থায়ী কমিটির একজন করে সদস্যকে দায়িত্ব দিয়ে কমিটি গঠনের কাজ চলছে। কমিটিতে একজন যুগ্ম মহাসচিব, একজন সাংগঠনিক সম্পাদক, একজন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিভাগের অধীন জেলাগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে রাখা হবে।