সংগীত ও নাট্যচর্চার বাতিঘর ময়মনসিংহ
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:১৪
ময়মনসিংহ হচ্ছে সংগীত ও নাট্যচর্চার কেন্দ বিন্দু। অনেকেই বলেন ময়মনসিংহ হচ্ছে সংস্কৃতি চর্চার খনি। সময়ের পরিবর্তনে, পৃষ্ঠপোষকতা, স্থানাভাবসহ নানা কারণে নিভু নিভু করে চলছে সংস্কৃতি চর্চা। সংস্কৃতিকে ভালবেসে মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীর দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী ময়মনসিংহ শহরের ‘শশীলজ’ এ (বর্তমানে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, মহিলা-ময়মনসিংহ) প্যারিস থেকে তিন লক্ষ টাকায় একটি মিউজিক্যাল স্টেয়ার কেস-‘সংগীত সিঁড়ি’ স্থাপন করেছিলেন। দ্বিতল রাজপ্রাসাদের ওপরে উঠার সিঁড়িতে স্থাপন করা হয়েছিল এই মিউজিক্যাল স্টেয়ার কেসটি। সিঁড়ি বেয়ে উঠার সময় এক ধরনের সংগীত সুর বেজে উঠত এতে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বিকেলে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। দেড় মিনিটের স্থায়ী এই ভূমিকম্পে জমিদারি বিলাসের সাক্ষী শশীলজ ধসে পড়ে। সুসংয়ের রাজা জগত্কৃষ্ণ সিংহ পুত্রসহ দালান চাপায় মারা যান। এসময় শশীকান্ত ছিলেন কলকাতায়। টেলিগ্রামে কলকাতায় এই খবর পাঠানো হলে শশীকান্ত প্রথমেই জানতে চাইলেন, হুয়াট এবাউট মাই স্টেয়ার কেস। এরকম সংগীত পাগল ছিলেন ময়মনসিংহের জমিদার পরিবারগুলো। জমিদার পরিবারের সংগীত পিপাসার প্রভাবেই শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাচীন জেলা ময়মনসিংহ গান বাজনার দিক থেকে কোনকালেই পিছিয়ে ছিল না। সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক ময়মনসিংহে গান-বাজনার চর্চা চলে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকে। এজন্য কেউ কেউ রসিকতা করে বলে My-men-sing আমার মানুষ গান করে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বেলায়েত খাঁ, নজাকত আলী, সালামত আলী, মোহাম্মদ আলী, খাদিম হোসেন খাঁ, মীর কাশিম খাঁর মত কিংবদন্তী ওস্তাদগণ ময়মনসিংহে এসে সংগীত পিপাসুদের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন যুগ যুগ ধরে। মুসলিম লীগের জনসভায় গান গেয়েছেন মরহুম আব্বাস উদ্দিন। সংগীত পিপাসু স্থানীয় জমিদাররা এসব শিল্পীকে লালন ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন নিজেদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, গৌরীপুর, রামগোপালপুর ও শহর ময়মনসিংহের রাজপরিবারে এসব গুণী শিল্পীর ছিল বেশ কদর, অবাধ যাতায়াত। রাজপরিবারের রঙ্গমঞ্চ ছাড়াও সংগীত চর্চা ও নাটকের জন্য ওই সময়ে ময়মনসিংহে গড়ে তোলা হয়েছিল বেশ কয়েকটি ওপেন স্থাপনা। সংগীত পিপাসু গৌরীপুর জমিদারদের নিজস্ব রঙ্গমঞ্চ ও নাচঘর থাকার পরও সর্বসাধারণের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল আলাদা একটি মঞ্চ। পরে সেটি ঝলমল সিনেমা হল হিসাবে পরিচালনা করা হয়। একইভাবে রামগোপালপুর ও মুক্তাগাছা জমিদারদের বাসাবাড়িতেও ছিল আলাদা রঙ্গমঞ্চ। মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির ভেতরের নাচঘরে ছিল রিভলভিং স্টেজ। নাচ করার সঙ্গে এই মঞ্চটি অনবরত ঘুরত বলেই এই নামকরণ। তবে ময়মনসিংহে জমিদার পরিবারে এরকম কিছু না থাকলেও নাট্য ও সংগীত চর্চার আয়োজনে কোন কমতি ছিল না।
ব্রিটিশ অধীন অবিভক্ত ভারতে ১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা হিসাবে জন্মলাভ করলেও সংগীত ও নাট্য চর্চাসহ সংস্কৃতির বিকাশে শহরের প্রাণকেন্দে ছিল না কোন সাংস্কৃতিক কেন্দ । মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর উদ্যোগে ১৮৮৬ সালে শহরে প্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয় টাউনহল মিলনায়তন। এর নাম ছিল প্রথমে সূর্যকান্ত হল।
এই হলরুমে জমিদার পরিবারের সদস্যরা মিলিত হতেন নানা অনুষ্ঠানে। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহাদাত হোসেন খান হীলু ‘টাউন হল মঞ্চ ও ময়মনসিংহের মঞ্চ প্রসঙ্গ’ নিয়ে বলেন, ব্রিটিশ শাসক ও শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আমন্ত্রিত হতেন জমিদার পরিবারের অনুষ্ঠানে।