ভাষণ

‘আমাকে শুধু সাহস দাও’ — জেনিফার বাফেট

আমরা বিশ্বাস করি নারী-পুরুষ পরস্পরের সাথে মিলিতভাবে কাজ করে ছন্দময়তার সাথে বিশ্বকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। উন্নয়নের জন্য বর্তমান বিশ্বে নারী পুরুষের মিলিত প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই। মানুষের সাথে মেশা এবং গোড়া থেকে নিজেকে গড়ে নিজেদের একটি গোষ্ঠি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের সমাজে এই সাম্য সুদূরপরাহত, অসাম্য এবং নারীদেরকে সব সময় পুরুষের থেকে পিছিয়ে পড়া এবং কম মেধাবী মনে করা হয়। সমাজে, সরকারে, বড়ো প্রতিষ্ঠানে কিংবা বাজেটে তাদের অবস্থান নেই বললেই চলে। আমাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হলো নারীদের একটা প্রভাব সৃষ্টি। সেটা আমাদের অংশীদারিত্ব এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। আমরা যুদ্ধে আহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন এবং তাদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য, পাচার হওয়া নারী যাদেরকে সমাজ ভালো চোখে দেখে না এছাড়া বিভিন্ন কারণে যে সকল নারী পিছিয়ে পড়েছেন তাদেরকে নিয়ে কাজ করছি। আমরা চাই না কোনো নারী কারো দ্বারা নিগ্রহের শিকার হোক। আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে, নারীর সাহায্য ছাড়া কিন্তু এই পৃথিবীতে আগমন থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজে এগিয়ে যাওয়া পুরুষের পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু নারীরা পুরুষের দ্বারাই কিংবা পুরুষের কারণেই সব থেকে বেশি নিগ্রহের শিকার হয়। কিন্তু এই পরিস্থিতির সমাপ্তি প্রয়োজন। আমাদের সবার মাঝেই পুরুষ-নারী দুটি সত্তা বিদ্যমান। আমাদের মনস্তত্ত্বও এই দুটি সত্তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। এহেন মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। নিত্যনতুন প্রযুক্তির আগমনে জীবন দিনকে দিন সহজতর হচ্ছে। কিন্তু আমরা কী কখনো ভেবে দেখেছি, এটা কাদের জন্য! এটা আমাদের জন্যই এবং তা তৈরিও হচ্ছে আমাদের হাত দিয়েই। মনে রাখতে হবে নারী-পুরুষ সবার অনুভূতি সমান। মানুষ আর যন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য হলো- মানুষের অনুভূতি আছে আর যন্ত্রে তা নেই। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— মানবিকতাবোধকে ধারণ করা। উন্নতির বেড়াজালে নিজেকে এমনভাবে বদ্ধ করা যাবে না যাতে আত্মা নিঃস্ব হয়ে যায়। আমি আজ পর্যন্ত যতোজন নারী দেখেছি তার মধ্যে আমার কাছে সব থেকে শক্তিশালী মনে হয়েছে ভারতের এক নারীকে যাকে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য করা হয় এবং সমাজ থেকে বিতাড়িত করা হয়। তাকে নেয়া হয়েছিল একজন বালিকা হিসেবে এবং রূপান্তরিত করা হয়েছিল একটি পণ্যে। ওই নারীকে পুরুষ পণ্যের মতো ব্যবহার করতো। কিন্তু তিনি তার মেয়েকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তাকে শিক্ষিত করতে পেরেছিলেন। কথাগুলো সহজ মনে হলেও বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি। সে বলেছিল— আমাকে শুধু সাহস দাও। আর কিছু চাই না! আমার কাছে মনে হয় কষ্টের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করে এবং সামনে কোনো আশা না থাকে। ভারতের যে নারীর কথা একটু আগে বললাম তিনি আমার শিক্ষক। তিনি আমার মধ্যে নতুন বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছেন। তাকে আমি অনেক শক্তিশালী এজন্যে বলেছি যে, চারপাশের সবকিছু প্রতিকূলে থাকা সত্ত্বেও নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে অটল থেকেছেন। নারীদের নিজেদের জন্য সময় খুবই কম। স্বামী-সংসার-অফিসের কাজের ফাঁকে নিজের জন্য মেলে না সময়। আমি বলবো নিজেকে সময় দিতে হবে। একজন নারীর জন্য শ্রেষ্ঠ সময়টা তখনই আসে যখন সে অনুভব করতে শুরু করে যে সে তার নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক, নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম, নিজের ভাবনাগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। নিজের দুনিয়াকে নিজের মতো করে সাজাতে পারে। তখনই সে হয়ে ওঠে বিশেষ কেউ।