স্নোডেনের কী অপরাধ
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:২৪
যার জন্য করি চুরি সেও বলে চোর-ইন্টারনেটে মার্কিন গোয়েন্দাগিরির খবর ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এডওয়ার্ড স্নোডেনের অবস্থা অনেকটা এমনই। তিনি এখনো কোনো দেশে আশ্রয় পাননি। গত ২৩ জুন থেকে আটকে আছেন রাশিয়ার শেরেমিটিয়েভো বিমানবন্দরের ট্রানজিট এলাকায়। যে কারণে তার এত দুর্ভোগ, এত অনিশ্চয়তা তা হল—তিনি বিশ্ববাসির কাছে বলে দিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের ওপর আধিপত্যের অংশ হিসেবে ইন্টারনেটে মানুষের যোগাযোগের ওপর নজরদারি করছে। মানুষ ই-মেইল, স্কাইপি বা ফেইসবুকে কী করছে তার সবকিছুই দেখে ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। শুধু সাধারণ মানুষ নয়; বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ই-মেইল চালাচালি কিংবা কথোপকথনে তারা আঁড়ি পেতেছে। এ নজরদারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) বিশাল আয়োজন নিয়ে বসেছে। তারা ইন্টারনেটে নজরদারির গোপন এই প্রকল্পের নাম দিয়েছে প্রিজম। ২০০৭ সাল থেকে প্রিজম পরিচালিত হচ্ছে। মার্কিন নাগরিক এডওয়ার্ড স্নোডেন এই প্রিজম প্রকল্পে বেশ কয়েকবছর যাবত্ চাকরি করছিলেন। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে অন্যায় নজরদারির মাধ্যমে মানুষের তথ্য চুরি করছে। দেখেছেন কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো জেনে নিচ্ছে।
স্নোডেনের প্রকাশ করা তথ্যে আরো জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করেছে যুক্তরাজ্যের সরকারও। ব্রিটেনে পরিচালিত হয়েছে জিসিএইচকিউ নামে আরেকটি নজরদারি কার্যক্রম। উভয় দেশের গোয়েন্দা সংস্থা মিলে লুটে নিয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সব গোপন খবর। চীন বা রাশিয়ার মত শত্রু দেশ নয় বরং জার্মান, ফ্রান্সের মত বন্ধুরাষ্ট্রও এ নজরদারি থেকে বাদ পড়েনি। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মত শক্তিশালী রাষ্ট্রজোটের যোগাযোগেও আঁড়ি পেতেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন অন্যায় নজরদারির খবর ফাঁস করে দিবেন বলেই জুন মাসের মাঝামাঝি তিনি কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে হংকংয়ে পাড়ি জমান। ব্রিটেনের গার্ডিয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোষ্ট পত্রিকার মাধ্যমে এনএসএ’র প্রিজম কারবারের খবর ফাঁস করে দেন। স্নোডেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি ভালো করেই যানেন। তবুও শুধুমাত্র বিবেকের তাড়নায় তিনি এই তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি নিলেন। তার মতে এ অন্যায় চলতে পারে না। তিনি দাবি করেন, তার জীবনে কোনো কিছুর অভাব ছিল না। মাসিক ২ লাখ ডলারের বেতন, ছিল অপরুপ সুন্দরী জীবনসঙ্গী। সবকিছু ত্যাগ করে তিনি বিশ্ববাসির কল্যাণের কথা ভেবেছেন।
চীন, জার্মান, ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাত্ক্ষণিকভাবে গোপন নজরদারির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বড় বাণিজ্য চুক্তিও এ ঘটনার কারণে আটকে গেছে। কিন্তু যে মানুষটি জীবন বাজি রেখে এতসব তথ্য প্রকাশ করল তার প্রতি রাষ্ট্রগুলো কী ঠিক আচরণ করছে? চীন সরকারের আনুকূল্য পাবেন এমন প্রত্যাশায় স্নোডেন প্রথমে হংকংয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো ভরসা না পেয়ে ২৩ জুন তিনি লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। আটকে যান রাশিয়ার শেরেমিটিয়েভো বিমানবন্দরের ট্রানজিটে এসে। পুনরায় বিমানে উঠার আগেই যুক্তরাষ্ট্র স্নোডেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় তথ্য চুরির অভিযোগ আনে এবং তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে। শুধু তাই নয়, তারা হুঁশিয়ার করে বলে, যে দেশ স্নোডেনকে আশ্রয় দেবে সে দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হবে।
কোনো ট্রাভেল ডকুমেন্ট না থাকায় ২৩ জুন থেকে স্নোডেন বিমানবন্দরেই আটকে আছেন। এ পর্যন্ত তিনি মোট ২১টি দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। এর মধ্যে জার্মান, ফ্রান্স, স্পেইন এবং ইন্ডিয়ার মত দেশগুলো তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। বলিভিয়ার প্রেডিডেন্ট ইভো মোরালেস রাশিয়া থেকে স্নোডেনকে নিয়ে যাচ্ছেন এমন সন্দেহে ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল এবং স্পেন তাদের আকাশসীমায় ঐ বিমানকে প্রবেশ করতে দেয়নি। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে সেই বিমানকে অবতরণ করতে হয়েছে। শুধুমাত্র ল্যাটিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর এবং নিকারাগুয়া স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। তবে স্নোডেন ঐ সব দেশে অবতরণের আগ পর্যন্ত কিছুই করতে পারছে না দেশগুলো। এদিকে রাশিয়া বলেছে, স্নোডেন যদি যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো নতুন ক্ষতি না করার প্রতিশ্রুতি দেয় তবে তার স্নোডেনকে আশ্রয় প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করবেন। সম্প্রতি স্নোডেন ঐ বিমানবন্দরেই হিউম্যান রাইটস গ্রুপের সদস্যদের সাথে বৈঠক করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশের মত আচরণ করছে। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্টের বিমান আটক করে ইউরোপের যা বুঝিয়েছে, তাতে রাশিয়া ছেড়ে লাতিন আমেরিকায় যাওয়া সহজ নয় বলে মনে করছেন স্নোডেন। হুইসল ব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেনের এ অভিজ্ঞতা ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য কোনোভাবেই শুভ নয়; এর ফলে ক্ষমতাধরদের অপকর্ম সম্পর্কে যারা মুখ খুলতে চান তারা বেশ নিরুত্সাহিত হবেন।